অবাধ্য সন্তানকে সম্পদ থেকে বঞ্চিত করা যাবে কী?
ছবি: সংগৃহীত

আমার ছেলে আমার কথা শোনে না, বৃদ্ধ বয়সে আমাদের ভরণপোষণ দেয় না; তাই তাকে আমি ত্যাজ্যপুত্র করলাম এবং সম্পত্তি থেকে এক আনাও দেব না!—বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মধ্যবিত্ত সমাজে এমন আক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত প্রায়শই দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অনেক সন্তানই বৃদ্ধ মা-বাবাকে দেখভাল করছে না, উল্টো তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালাচ্ছে। চরম ক্ষোভ ও মানসিক কষ্ট থেকে অনেক বাবা-মা তাদের অবাধ্য সন্তানকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার ঘোষণা দেন। কিন্তু দেশের প্রচলিত আইন এবং ইসলামের অপরিহার্য বিধান অনুযায়ী, সত্যিই কি অবাধ্য সন্তানকে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব?

চলুন, আবেগ সরিয়ে রেখে বিষয়টি সহজ ও পরিষ্কারভাবে জেনে নেওয়া যাক।

ইসলামে মা-বাবার অবাধ্য হওয়াকে অন্যতম কবিরা গুনাহ বা মহাপাপ হিসেবেদ গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনের সুরা বনি ইসরাঈলে মহান আল্লাহ নিজের ইবাদতের পরেই মা-বাবার সঙ্গে উত্তম ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি শবেকদরের মতো বরকতময় রাতেও যে চার শ্রেণির মানুষকে আল্লাহ ক্ষমা করেন না, তাদের একজন হলো মা-বাবার অবাধ্য সন্তান।

এত বড় পাপী হওয়ার পরও, ইসলামী শরিয়তের অকাট্য নিয়ম হলো—কোনো সন্তান অবাধ্যতার কারণে তার মা-বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয় না। অর্থাৎ, সন্তান যতই খারাপ হোক না কেন, মা-বাবার মৃত্যুর পর অন্য ভাই-বোনদের মতোই সে তার নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার আইনি ও ধর্মীয় অধিকার রাখে।

বাংলাদেশের প্রচলিত মুসলিম আইন ও শরিয়ত অনুযায়ী, ‘ত্যাজ্যপুত্র’ বা ‘উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত’ করার মৌখিক বা লিখিত ঘোষণার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। বিখ্যাত ফিকহ শাস্ত্রের কিতাব ‘তাকমিলায়ে রদ্দুল মুহতার’ এ স্পষ্ট বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার বাধ্যতামূলক, এটি স্থগিত বা বাতিল করলেই বাতিল হয় না।

রাসূলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যে ব্যক্তি তার ওয়ারিশের উত্তরাধিকার কর্তন করল, আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিন তার জান্নাতের উত্তরাধিকার কর্তন করবেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ)। সুতরাং, রাগ বা ক্ষোভের বশে কোনো সন্তানকে মিরাস থেকে বঞ্চিত করা সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

তবে সমাধান কী? প্রাজ্ঞ আলেম ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সম্পদ থেকে বঞ্চিত করলে সন্তানের অবাধ্যতা ও একগুঁয়েমি আরও বেড়ে যায়, যা পারিবারিক অশান্তি আরও উসকে দেয়। এর চেয়ে উত্তম সমাধান হলো: সন্তানকে নিয়মিত ধর্মীয় ও নৈতিক নসিহত করা। তাদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দোয়া করা।

জীবিত অবস্থায় মা-বাবা চাইলে তাদের সম্পত্তির কিছু অংশ দান (হেবা) বা অসিয়তের মাধ্যমে সৎ সন্তানদের নামে লিখে দিতে পারেন, তবে তা যেন অন্য সন্তানকে সম্পূর্ণ ঠকানোর উদ্দেশ্যে বা কেবল প্রতিহিংসাবশত না হয়।

সন্তানের অবাধ্যতা যেমন পরকালের কঠিন শাস্তির কারণ, তেমনি তাকে জোরপূর্বক উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করাও মা-বাবার জন্য গুনাহের কাজ। নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই সময়ে পরিবারগুলোতে নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে, যাতে কোনো মা-বাবাকে বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের অবাধ্যতার শিকার হতে না হয়।

জা. অর্থনীতি/ উমার