ক্রীড়া প্রতিবেদক: বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে এখন স্বপ্ন দেখার সময়। যে সংস্করণে এক সময় জয় খুঁজতেই হিমশিম খেতে হতো, সেখানে এখন বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কাছাকাছিও নিয়ে এসেছে। এবার সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করার মিশন শুরু হচ্ছে ঘরের মাঠে। প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। আজ মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শুরু দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথমটি!
গত এক বছরে টেস্টে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আট ম্যাচে পাঁচ জয়, দুটি ড্র আর একটি হার। শুধু ফল নয়, ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেও ধারাবাহিকতার ছাপ রেখেছেন ক্রিকেটাররা। ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি পেয়েছেন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, মুশফিকুর রহিম ও তানজিদ হাসান তামিম। বোলিংয়ে ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কীর্তি গড়েছেন তাইজুল ইসলাম, মেহেদী হাসান মিরাজ ও হাসান মাহমুদ। টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের নতুন একটা অবস্থান তৈরি করতে শুরু করেছে বাংলাদেশ।
এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখার মঞ্চ এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজ। দুই ম্যাচের সিরিজের প্রথমটি আজ মিরপুরে, দ্বিতীয়টি ৮ নভেম্বর সিলেটে। সিরিজটি শুধু ঘরের মাঠে আরেকটি দ্বিপক্ষীয় লড়াই নয়, ২০২৫-২৭ বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলেও এর গুরুত্ব অনেক। বর্তমানে ৫৫.৫৬ শতাংশ সফলতার হার নিয়ে চারে আছে বাংলাদেশ। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে দুই টেস্ট জিততে পারলে সেই হার বেড়ে দাঁড়াবে ৬৬.৬৭ শতাংশে। ফাইনালের দৌড়ে তখন আরও ভালো অবস্থানে চলে আসবে শান্তর দল।
তবে ফাইনালের সমীকরণ নিয়ে আপাতত ভাবতে রাজি নন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তার চোখ প্রথম টেস্টে, এমনকি দ্বিতীয় টেস্টও এখন ভাবনায় নেই। বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য ছোট ছোট ধাপে এগোনোর যে পরিকল্পনা, সেটিই অনুসরণ করতে চান তিনি। সংবাদ সম্মেলনে শান্তর বক্তব্য, ‘সত্যি বলতে কি একদমই ভাবিনি (ফাইনাল খেলতে কী করতে হবে, তা নিয়ে)। আমি শুধু এই টেস্টটা নিয়েই ভাবছি, এমনকি এই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টও ভাবনায় নেই।’
অধিনায়কের এই ভাবনার পেছনে রয়েছে দলের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। গত কয়েক বছর ধরে নির্দিষ্ট ম্যাচ ও সিরিজকে সামনে রেখে এগিয়েছে বাংলাদেশ। এবারও ব্যতিক্রম হতে চান না তারা। শান্তর বিশ্বাস, প্রতিটি ম্যাচে নিজেদের কাজ ঠিকভাবে করতে পারলে বড় লক্ষ্য এমনিতেই পূরণ হবে। তাই পয়েন্ট টেবিলের হিসাবের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সেই বেশি মনোযোগ।
এদিকে টেস্ট ক্রিকেটে সাম্প্রতিক সাফল্য নিয়ে উচ্ছ্বাস থাকলেও আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না বাংলাদেশ। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে শান্ত রসিকতা করলেও টেস্ট নিয়ে বাড়তি আগ্রহকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। তবে তার মতে, বর্তমান সাফল্যই শেষ কথা নয়। উন্নতির আরও অনেক জায়গা রয়েছে। শান্তর ভাষায়, ‘ভালো লাগছে সবাই টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছেন। তবে আমার মতে যে সংস্কৃতির কথাটা বললেন, সেটা আরও দুই-তিন বছর আগে থেকে শুরু হয়েছে। এটা ধরে রাখতে হবে। অনেক ভালো করার সুযোগ আছে। যেভাবে আসলে আমরা ক্রিকেটাররা চিন্তা করছি, আমরা ভালো করছি কিন্তু ক্রিকেটাররা এখনও খুশি না। আমাদের মতে এখান থেকে আরও উন্নতির জায়গা আছে।’
দলের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘প্রস্তুতির দিক থেকে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। যতটুকু সময় পেয়েছি, প্রত্যেকে নিজের যে জায়গাগুলোতে প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, সেভাবে প্রস্তুতি নিতে পেরেছে। প্রতিপক্ষ কেমন প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করছি না। আমাদের প্রস্তুতি কতটা ভালো হয়েছে এবং আমরা কতটা ভালোভাবে তৈরি হয়ে ম্যাচটা খেলতে পারি, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গা থেকে আমি খুশি।’
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজের গুরুত্ব আরও বাড়ছে সামনের সূচির কারণে। এই সিরিজ শেষ করেই দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্দেশে উড়াল দেবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সেখানে ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হবে দুই টেস্টের সিরিজ। এর পর আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শেষ সিরিজ। আগামী এক মাসে টেস্ট ক্রিকেটে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। সেই দীর্ঘ অভিযানের শুরুটা ঘরের মাঠে ভালোভাবে করতে চায় দল।
তবে প্রতিপক্ষের শক্তি কিংবা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের চাপ-কোনোটিই বাড়তি বোঝা হয়ে উঠুক, তা চান না শান্ত। তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলের প্রক্রিয়া, ক্রিকেটারদের নিবেদন এবং মাঠে নিজেদের সামর্থ্যের পুরোটা উজাড় করে দেওয়া। তিনি বলেন, ‘চাপ ও চ্যালেঞ্জ সব সময়ই থাকবে। গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা এই বিষয়গুলো কীভাবে উপভোগ করছি, নিজেদের প্রক্রিয়া মেনে চলছি কি না এবং নিজেদের কাজগুলো ঠিকমতো করছি কি না। খেলোয়াড়রা মাঠে নিজেদের ১২০ শতাংশ দিচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলো যদি আমরা ঠিকভাবে করতে পারি, তাহলে আমার বিশ্বাস, এই দুই ম্যাচে আমরা ভালো টেস্ট ক্রিকেট খেলব এবং ভালো একটি টেস্ট সিরিজ কাটাতে পারব।’
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলে এখন বাংলাদেশের ওপরে অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা। শীর্ষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সফলতার হার ৭৫ শতাংশ, নিউজিল্যান্ডের ৭২.২২ শতাংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ৬৬.৬৭ শতাংশ। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি টেস্ট রয়েছে। তাই মিরপুরের আজকের ম্যাচটি কেবল সিরিজের প্রথম লড়াই নয়, ফাইনালের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার পথেও গুরুত্বপূর্ণ এক ধাপ।