মানুষের দোরগোড়ায় প্রয়োজনীয় আর্থিক সেবা পৌঁছে দিচ্ছে এনআরবিসির এজেন্ট ব্যাংকিং

দেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠন এখন প্রতিটি ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এনআরবিসি ব্যাংক গ্রাহক আস্থা বৃদ্ধির জন্য সময়োপযোগী কিছু পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের ব্যাংকিংসেবার আওতায় আনতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করেছে। এজেন্ট ব্যাংকিং, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা অর্থায়ন, কৃষিঋণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সহজতর ব্যাংকিংসেবা সম্প্রসারণে ব্যাংকটি বিস্তৃত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক জাতীয় অর্থনীতি কথা বলেছে এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. তৌহিদুল আলম খানের সঙ্গে

জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমান বাস্তবতায় এনজারবিসি ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিত সম্পর্কে বলুন।

ড. তৌহিদুল আলম খানঃ পরিবর্তন সবসময় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। দেশের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় ব্যাংকিং খাতেও জবাবদিহি, সুশাসন ও স্বচ্ছতার বিষয়টি আরও গুরুত্ব গেয়েছে। আমাদের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা সাজায় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজ করছি। আমরা চাই ব্যাংকের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ হোক নীতিনিষ্ঠ, ঝুঁকি সচেতন এবং সর্বোচ্চ অরুত্ব দিয়ে।

আমাদের মূল লক্ষ্য হলো একটি শাশদী টেকসই এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা। পরিচালনা প্রখন্দ ব্যবস্থাপনা এবং কর্মকর্তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যে বাবসায়িক কার্যক্রমে গতি এসেছে। আমরা শুধু ব্যবসার পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নয়, ব্যবসার গুণগতমান উন্নয়নের দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছি।

জাতীয় অর্থনীতি: পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার প্রধান ফোকাস কী?

ড. তৌহিদুল আলম খান: আমানের অগ্রাধিকার খুবই স্পষ্ট। প্রথমত, সুশাসন প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করা। তৃতীয়ত, গ্রাহককেন্দ্রিক ব্যাংকিংসেনা নিশ্চিত করা।

আমরা মনে করি, একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি শুধু আর্থিক সূচকে নয় বরং জাহকের আস্থা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদের ওপর নির্ভর করে। তাই ডিফিটাল সেবা সম্প্রসারণ, সাইবার নিরাপয়া জোরদার, গ্রাহকসেবার মান উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতি: ব্যক্তিগতভাবে আপনার প্রধান লক্ষ্য কী? 

ড. তৌহিদুল আলম খান: আমি চাই এনআরবিসি ব্যাংক এমন একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক যেখানে প্রায়ক নিশ্চিন্তে তার সঞ্চয় রাখবেন, উদ্যোক্তা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিনিয়োগের প্রণয়ন পাবেন এবং সাধারণ মানুষ সহজে আধুনিক ব্যাংকিংসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

আমার বিশ্বাস, ক্যাংকিং কেবল মুনাফার কবসা নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অন্তর্ভুক্তি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন, নারী উদ্যোক্তন অধ্যায়ন, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ব্যাংককে জাতীয় উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমানে এনআরবিসি ব্যাংকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. তৌহিদুল আলম খান: বর্তমান সময়ে গুরো ব্যাংকিং খাতই কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। খেলাপি ঋণ, বৈশ্বিক অ্যানৈতিক অনিশ্চয়তা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিগত বৃত্তি- এসব বিষয় সব ব্যাংকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আমরা এসব চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করতে চাই। সুশাসন, বিচক্ষন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে এনআরবিসি ব্যাংককে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই আমাদের লক্ষ্য।

জাতীয় অর্থনীতি: খেলাপি ঋণ মোকাবিলায় আপনার কৌশল কী? 

ড. তৌহিদুল আলম খান: খেলাপি ঋণ কমাতে আইনগত ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সময়োপযোগী ঋণ মূল্যায়ন, নিয়মিত তদারকি এবং দায়িত্বশীল ঋণ বিতরণ।

আমরা নতুন ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করছি। একইসঙ্গে বিদ্যমান ঋণ পুনরুদ্ধারে আলোচনাভিত্তিক সমাধান, পুনঃতফসিলের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো সুস্থ ঋণ। ঋণ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। 

জাতীয় অর্থনীতি: এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের অবস্থান ও পরিকল্পনা কী?

ড. তৌহিদুল আলম খান: এনআরবিসি ব্যাংক এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের অনগ্রসর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিংসেবা পৌঁছে দিতে নিরলসভাবে কাজ করছে। বর্তমানে ৬২৪টি এজেন্ট পয়েন্টের মাধ্যমে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজারটি আঅ্যকাউন্ট পরিচালনার পাশাপাশি আমার সরকারের বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রমের অর্থ বিতরণে সহায়তা করছি। এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিডি, হিজড়া, কেনেসহ নানা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আমরা 'স্টুডেন্ট ব্যাংকিং' সেবাও দিয়ে আসছি, যাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ব্যাংকিং সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হয়। আমাদের লক্ষ্য হলো এ সেবা আরও বিস্তৃত করে পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও সহজে, দ্রুত ও নিরাপদে ব্যাংকি। সুবিধা পায়।

আমরা বিশ্বাস করি, একটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি তখনই সফল হবে, যখন শহরের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও সমানভাবে আধুনিক ব্যাকিং সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। 

জাতীয় অর্থনীতি: আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে এনআরবিসি ব্যাংকের দর্শন কী?

ড. তৌহিদুল আলম খান: এনআরবিসি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম দেশের অনগ্রসর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে সহজ, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যাংকিংসেবা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যারা আগে প্রথাগত ব্যাংকিংসেবার বাইরে ছিলেন তারাও এখন আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারছেন। এতে একদিকে যেমন টাকা-পয়সার নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে লেনদেনও হয়ে উঠছে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ। 'আর্থিক সাক্ষরতায় সূচিত হোক নিরাশদ ক্যাশলেস লেনদেন' এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আমাদের এজেন্ট ব্যাংকিং সেটওয়ার্ক অ্যাশলেস বাংলাদেশের যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ সেবা বিস্তারের মাধ্যমে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতে আমরা এ নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারণ করতে চাই এবং সেবার মান উন্নয়নে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন অব্যাহত রাখব। 

জাতীয় অর্থনীতি: আগামী পাঁচ বছরে এজেন্ট ব্যাংকিংকে কোথায় দেখতে চান? 

ড. তৌহিদুল আলম খান: আগামী পাঁচ বছরে আমরা এজেন্ট ব্যাংকিংকের একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রামীণ আর্থিক সেবা প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। শুধু হিসাব খোলা বা নগদ লেনদেন নয় ধরং ডিজিটাল সঞ্চয়, ক্ষুদ্রঋণ কৃষি অর্থায়ন, বিমাসেবা, রেমিট্যান্স এবং সরকারি ভাতা বিতরণসহ বহুমাত্রিক সেবা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

আমাদের লক্ষ্য হবে দেশের এমন এলাকাগুলোতে পৌঁছানো যেখানে এখনও আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা সীমিত। প্রযুক্তির মাধ্যমে শহর ও গ্রামের সেবার ব্যবধান কমিয়ে আনা হবে। আমরা বিশ্বাস করি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই যখন প্রত্যন্ত অঞ্চনের একজন মানুষও সমান মর্যাদায় ব্যাংকিং সেবা পাবেন।

জাতীয় অর্থনীতি: বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতে কী ধরনের সংস্কার জরুরি?

ড. তৌহিদুল আলম খান: ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতায় জন্য সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং হি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং গ্রাহকসেবার মান বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ানোই হবে সবচেয়ে বড় সংস্কার। কারণ আস্থা থাকলে আমানত বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে।