আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক সংঘাত তীব্র রূপ নেওয়ায় গত আগস্টের শুরু থেকে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তর (ওসিএইচএ) বুধবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সহিংসতা থেকে বাঁচতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালানো এসব মানুষের প্রায় অর্ধেকই আশ্রয় নিয়েছেন দেশটির তাইজ প্রদেশে। এছাড়া সংঘাত চলাকালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) ২৫১ জন বেসামরিক নাগরিক হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ৫৭ জন নিহত এবং ১৯৪ জন আহত হয়েছেন। ওসিএইচএর তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের অর্ধেকই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু।
অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো, যা মোট বাস্তুচ্যুত পরিবারের প্রায় ৬০ শতাংশ। বাস্তুহারা হওয়ার প্রাথমিক দিনগুলোতে এই পরিবারগুলোকে জরুরি খাদ্য, স্বাস্থ্যসুরক্ষা উপকরণ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ওসিএইচএ উল্লেখ করেছে, নতুন করে বাস্তুচ্যুত হওয়া পরিবারগুলোর জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন নিরাপদ আশ্রয়, যার পরেই রয়েছে খাদ্য ও নগদ অর্থের চাহিদা। এই পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামো সুরক্ষার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাইজে ত্রাণ ও বাণিজ্যিক পণ্য নিরাপদে পৌঁছানোর পথ উন্মুক্ত রাখার তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ।
এদিকে হুথি বিদ্রোহীদের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধের কারণে তাইজ শহরের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রয়োজনীয় জ্বালানি, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর চরম সংকটে হাসপাতালগুলোতে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়া শিশু ও নবজাতকদের নিবিড় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাইজের অবরোধবিষয়ক দপ্তর এক বিবৃতিতে সতর্ক করে জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে হাসপাতালের শিশু ইনকিউবেটরগুলো সচল রাখা এবং জীবনরক্ষাকারী সামগ্রী পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইনকিউবেটরে থাকা বহু শিশুর প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করে সংস্থাটি দ্রুত জ্বালানি ও চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে।
গত জুলাইয়ে সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দেওয়ার পর দেশটির বিভিন্ন রণাঙ্গনে রক্তক্ষয়ী লড়াই বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এবং ধুবাব জেলার কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেয়। তবে এর প্রতিক্রিয়ায় গ্রামীণ তাইজের বিভিন্ন এলাকায় অগ্রসর হয়ে হুথি বিদ্রোহীরা শহরটির উত্তর, পশ্চিম ও পূর্ব দিকের পাহাড়ি অঞ্চল ঘিরে ফেলে এবং পুরো তাইজ শহরের ওপর অত্যন্ত কঠোর অবরোধ আরোপ করে।
ইয়েমেনে চলমান এই রক্তক্ষয়ী সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন হুথি বিদ্রোহীরা রাজধানী সানাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ দখল করে নেয়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট এই সংঘাতে হস্তক্ষেপ করে। দীর্ঘ এক দশকের সংঘাতের ধারাবাহিকতায় নতুন করে এই যুদ্ধ তীব্র হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় এখন আরও গভীর রূপ ধারণ করেছে।
জেএ/অভি