জাহিদ হোসাইন খান: পৃথিবীর ইতিহাসে কিছু মানুষের জীবন ও কর্ম তাদের মৃত্যুর পরও নতুন করে আলো ছড়ায়। সুইডিশ বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেল তাদেরই একজন। বিস্ফোরক ডিনামাইট আবিষ্কারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তার সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে নিলেন এক ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত। নিজের বিপুল সম্পদের বড় একটি অংশ রেখে গেলেন এমন এক উদ্যোগের জন্য, যার উদ্দেশ্য হবে মানবজাতির কল্যাণে অসামান্য অবদান রাখা মানুষদের সম্মানিত করা। সেই সিদ্ধান্ত থেকেই জন্ম নেয় নোবেল পুরস্কারের ধারণা।
বর্তমানে নোবেল পুরস্কার শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি নয়; এটি জ্ঞান, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও শান্তির প্রতি বিশ্বসমাজের সম্মিলিত শ্রদ্ধার প্রতীক। কিন্তু কীভাবে শুরু হয়েছিল এই পুরস্কারের যাত্রা? এর পেছনে রয়েছে একজন বিজ্ঞানীর জীবন, তার আবিষ্কার, সম্পদ এবং মৃত্যুর আগে লেখা একটি ঐতিহাসিক উইলের গল্প।
বিস্ফোরকের আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেল
১৮৩৩ সালের ২১ অক্টোবর সুইডেনের স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল। তার বাবা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক। ছোটবেলা থেকেই নোবেলের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান, রসায়ন ও প্রযুক্তিতে। পরবর্তী সময়ে তিনি বিস্ফোরক পদার্থ নিয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন।
উনিশ শতকে খনি খনন, পাহাড় কাটা, সুড়ঙ্গ নির্মাণসহ নানা কাজে বিস্ফোরক পদার্থের ব্যবহার বাড়ছিল। কিন্তু নাইট্রোগ্লিসারিনের মতো শক্তিশালী বিস্ফোরক ছিল অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি সহজেই বিস্ফোরিত হতে পারত, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ছিল বেশি। নোবেল এই বিস্ফোরককে তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও ব্যবহারোপযোগী করার চেষ্টা করেন।
১৮৬৭ সালে তিনি ডিনামাইটের পেটেন্ট লাভ করেন। এই আবিষ্কার খনি, নির্মাণ ও প্রকৌশল শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। একই সঙ্গে বিস্ফোরকের সামরিক ব্যবহারও তাকে বিপুল সম্পদের মালিক করে তোলে।
তবে নোবেলের জীবনকে কেবল একজন সফল উদ্ভাবকের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তার আবিষ্কার মানুষের নির্মাণকাজকে সহজ করলেও বিস্ফোরক প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক ব্যবহারের সম্ভাবনাও ছিল প্রবল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই দ্বৈত ভূমিকা তার জীবন ও উত্তরাধিকারকে ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি করে।
একটি উইল, যা বদলে দিল ইতিহাস
১৮৮৮ সালে আলফ্রেড নোবেলের ভাই লুডভিগ নোবেল মারা গেলে একটি ফরাসি সংবাদপত্র ভুল করে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশ করে। সংবাদটির শিরোনাম ও ভাষ্য ছিল তার বিস্ফোরক আবিষ্কার এবং তার ধ্বংসাত্মক প্রভাবকে কেন্দ্র করে। বহুল প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, এই ঘটনায় নোবেল নিজের মৃত্যুর পর পৃথিবী তাকে কীভাবে স্মরণ করবে, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। তবে এই সংবাদই সরাসরি তার নোবেল পুরস্কার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের একমাত্র কারণ ছিল— এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
জীবনের শেষদিকে তিনি নিজের সম্পদের ব্যবহার নিয়ে একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন। ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর প্যারিসে স্বাক্ষরিত তার শেষ উইলে তিনি সম্পদের সিংহভাগ একটি তহবিল গঠনের জন্য বরাদ্দ করেন। সেই তহবিলের আয় থেকে প্রতিবছর তাদের পুরস্কৃত করার কথা বলা হয়, যারা আগের বছরে মানবজাতির জন্য সর্বাধিক উপকার বয়ে এনেছেন।
নোবেলের উইলে পাঁচটি ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ ছিল— পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, শারীরবিদ্যা বা চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। তার ইচ্ছা ছিল, পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাপকের জাতীয়তা যেন বিবেচ্য না হয়; যোগ্য ব্যক্তিই যেন স্বীকৃতি পান।
১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির সান রেমোতে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর পর উইল বাস্তবায়ন নিয়ে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়। আত্মীয়স্বজনের আপত্তি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং পুরস্কার পরিচালনার কাঠামো তৈরি; সব মিলিয়ে কাজটি সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত তার ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার উদ্যোগ সফল হয়।
প্রথম পুরস্কার ১৯০১ সালে
আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর, ১৯০১ সালে প্রথমবারের মতো নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি— এই পাঁচ বিভাগে পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে উইলহেল্ম কনরাড রন্টজেন, রসায়নে ইয়াকোবুস হেনরিকুস ভ্যান’ট হফ, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমিল ফন বেরিং, সাহিত্যে সুলি প্রুদোম এবং শান্তিতে হেনরি ডুনাঁ ও ফ্রেদেরিক পাসি।
পুরস্কার নির্বাচন ও বিতরণের দায়িত্ব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ করা হয়। সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে, ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট চিকিৎসাবিজ্ঞানে এবং সুইডিশ একাডেমি সাহিত্যে পুরস্কার প্রদানের দায়িত্ব পায়। আর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্ব পায় নরওয়ের পার্লামেন্ট নির্বাচিত নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি।
১৯০১ সাল থেকে প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর, আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে পুরস্কার প্রদান একটি ঐতিহ্যে পরিণত হয়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাহিত্য বিভাগে পুরস্কার সাধারণত স্টকহোমে এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কার অসলোতে দেওয়া হয়।
অর্থনীতিতে নোবেল: পরে যুক্ত হওয়া একটি বিভাগ
নোবেলের মূল উইলে অর্থনীতির কোনো পুরস্কারের উল্লেখ ছিল না। ১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেভেরিজেস রিক্সব্যাংক তাদের ৩০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে একটি পুরস্কার প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়। ১৯৬৯ সালে প্রথমবারের মতো এই পুরস্কার দেওয়া হয়।