সিলেট প্রতিনিধি: সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের মামলায় রায় ঘোষণা করা হবে আজ। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর পর মামলাটির রায় মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) ঘোষণা করবেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার।
এর আগে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১৪ জুলাই রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন আদালতের বিচারক।
ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবুল হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, গত বুধবার আসামি পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারণ হয়।
মামলায় অভিযুক্তরা হলেন– নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, অর্জুন লস্কর, আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল, মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন, রবিউল ও মাহফুজুর রহমান। তারা নগরের টিলাগড় কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের গ্রুপ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
আদালত সূত্র জানায়, গত বছরের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর সাক্ষ্য গ্রহণকালে মোট ২৪ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে পাশবিক নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী, আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, এমসি কলেজের এক অধ্যাপক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক।
তবে সাক্ষ্য গ্রহণকালে বাদীর বিভ্রান্তিমূলক সাক্ষ্য দেওয়া নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ ছিল রাষ্ট্রপক্ষের।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ঘটে নারকীয় এ ঘটনা। ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রাবাস এলাকায় ঘুরতে যান এক দম্পতি। সে সময় স্বামীকে আটকে রেখে নববিবাহিত গৃহবধূকে (২০) গণধর্ষণ করা হয়। মামলার এজাহারের বর্ণনামতে, ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ। ফেরার সময় তারা গাড়ি থামিয়েছিলেন নগরের টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে। স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে রেখে স্বামী পার্শ্ববর্তী দোকানে গিয়েছিলেন। ওই সময় প্রাইভেটকারটি ঘিরে ধরে কয়েকজন তরুণ। প্রাইভেটকারসহ ওই দম্পতিকে তারা নিয়ে যায় বালুচর এলাকার এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে। সেখানে স্বামীর সামনেই গাড়ির ভেতর সংঘবদ্ধভাবে গৃহবধূকে ধর্ষণ করে ছয় তরুণ। পরে তাদের মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় ধর্ষকরা। আটকে রাখে তাদের গাড়িও।
ঘটনার রাতেই নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে নগরের শাহপরান থানায় এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ছয়জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে এবং দুজনকে অজ্ঞাত আসামি করে এসএমপির শাহপরান থানায় মামলা করেন। প্রাইভেটকারটি আটকে রেখে চাঁদাবাজির ঘটনায় আরেকটি মামলা হয়। মামলা দুটি প্রথমে পৃথক চললেও পরে উভয় মামলা একসঙ্গে চলার সিদ্ধান্ত হয়।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে সন্দেহভাজন দুজন ও এজাহারনামীয় ছয়জনসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা পরে আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এছাড়াও ডিএনএ পরীক্ষায় আট আসামির ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া যায়।
২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও শাহপরান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য গ্রেপ্তার আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি আদালত এই মামলার অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। পরে মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও আসামিদের যুক্তিতর্ক শেষে মামলার রায়ের তারিখ ধার্য করা হয়।
রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সবার চোখ থাকবে আজ আদালতের দিকে। ভয়ংকর অপরাধীদের চূড়ান্ত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার ছিলেন সিলেটসহ সারা দেশের মানুষ। আজ সেই দাবির বাস্তবায়ন ঘটতে যাচ্ছে।
—জা. অর্থনীতি/এএইচএ