ঢাকায় মাল্টিমোডাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়তে কৌশলগত পরিকল্পনা
•    মেট্রোরেল বাড়িয়ে এমআরটি লাইন হবে ৮টি 
•    ৫টি মনোরেলের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করবে বুয়েট
•    চালু হবে বৃত্তাকার নৌ-পথ ও রাজধানীর বাইরে ১০টি বাস টার্মিনাল 
•    ঢাকায় নামানো হবে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি সমন্বিত ও মাল্টিমোডাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে হালনাগাদ করা হয়েছে 'কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ২০২৬–২০৪৫'। হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি)-তে ৮টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, ২টি বিআরটি লাইন, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের ফিডার সার্ভিস হিসেবে মনোরল নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সভাকক্ষে ঢাকা মহানগরীর জন্য একটি সমন্বিত ও মাল্টিমোডাল গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে 'ঢাকা মহানগরীর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান' বিষয়ক এক আলোচনা সভায় এই পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়। সভায় বৃহত্তর ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার কৌশলগত দিকনির্দেশনা, চলমান প্রকল্পসমূহ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয় এবং একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়সমূহ নিয়ে আলোচনা হয়।

ঢাকায় হবে ৮টি মেট্রোরেল
সভায় জানানো হয়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলা নিয়ে বিস্তৃত পরিবহন পরিকল্পনা সমন্বয়ের কাজ করছে ডিটিসিএ। ১১টি মন্ত্রণালয় ও ২৭টির অধিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে মাধ্যমে এ অঞ্চলের পরিবহন অবকাঠামো পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকির কাজ করছে  সংস্থাটি। ডিটিসিএ কর্তৃক আগামী দুই দশকের পরিবহন উন্নয়নের দিকনির্দেশক দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা 'কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ২০২৬–২০৪৫' উপস্থাপন করা হয়।

এই পরিকল্পনায় ৮টি মেট্রোরেল (এমআরটি) লাইন, ২টি বিআরটি লাইন, ৩টি রিং রোড, ৮টি রেডিয়াল সড়ক, ৬টি এক্সপ্রেসওয়ে এবং ২১টি ট্রান্সপোর্টেশন হাব নির্মাণের পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক ২০২৩ সালের ১৯.৮ কিলোমিটার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০৩০ সালে প্রায় ৭২.২ কিলোমিটার, ২০৩৫ সালে ১৩৭.৮ কিলোমিটার এবং ২০৪৫ সালে ২৬৮.৫ কিলোমিটারে উন্নীত হবে।

সভায় নগরীতে গণপরিবহনের ক্রমহ্রাসমান অংশ বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। হালনাগাদকৃত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (ইউআরএসটিপি) অনুযায়ী, দৈনিক যাতায়াতে গণপরিবহনের অংশ ২০১৪ সালের ২২.৮ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ২০২৩ সালে ৮.৯ শতাংশে নেমে এসেছে; একই সময়ে মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার ও ব্যক্তিগত গাড়ির অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বক্তারা মত দেন যে, নির্ভরযোগ্য ও সমন্বিত গণপরিবহনের মাধ্যমে এই প্রবণতা পাল্টে দেওয়াই মাল্টিমোডাল পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু।

৫টি মনোরেলের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই করবে বুয়েট
মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের ফিডার সার্ভিস হিসেবে ডিটিসিএ মনোরেল বাস্তবায়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইউআরএসটিপি-তে মোট প্রায় ৭৯.৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ৫টি মনোরেল করিডোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মনোরেলের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই (পিএফএস) সম্পন্ন করতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’কে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 

আগামী তিন মাসের মধ্যে অগ্রাধিকারযোগ্য করিডোর নির্ধারণ এবং ছয় মাসের মধ্যে পিএফএস প্রতিবেদন দাখিলের কথা বলা হয়েছে। সারা দেশ থেকে আগত যানবাহনকে নগরীর অভ্যন্তরে না প্রবেশ করে বাইপাস করার লক্ষ্যে ডিটিসিএ ঢাকার চারদিকে ৩টি রিং রোড—প্রায় ৮৮.৮ কিলোমিটারের ইনার রিং রোড, প্রায় ১৩২.৮ কিলোমিটারের মিডল রিং রোড এবং প্রায় ১৭৮ কিলোমিটারের আউটার রিং রোড—সওজ, বিবিএ ও দুই সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়নের কাজ করছে। 

চালু হবে বৃত্তাকার নৌ-পথ ও বাস টার্মিনাল ১০টি
পরিকল্পনায় সদরঘাট থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি বৃত্তাকার নৌপথ এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত একাধিক ঘাট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা রাজধানীর নদীকেন্দ্রিক যাতায়াত পুনরুজ্জীবিত করবে। যানজট নিরসনে সরকারের অঙ্গীকারের আলোকে মহানগরীর অভ্যন্তরের ৪টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল—মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া—পর্যায়ক্রমে নগরীর বাইরের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং একাজে ডিটিসিএ সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডারের মধ্যে সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে ১০টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল, তন্মধ্যে ৪টি স্থানে উপরোক্ত টার্মিনালগুলো স্থানান্তরিত হচ্ছে। হেমায়েতপুর, কাঁচপুর, বাঘাইর, মদনপুর ও পূর্বাচলে অস্থায়ী ও স্থায়ী ডিপো ব্যবস্থার কার্যক্রমও সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলছে।

ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩৮ লাখ যাত্রী বাসের 
সভায় গণপরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ 'বাস রুট রেশনালাইজেশন (বিআরআর) ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়। বিআরটিএ অনুমোদিত ৪১৮টি রুটের মধ্যে জরিপকালে সক্রিয় পাওয়া গেছে মাত্র ৯৮টি। ডিমান্ড অ্যানালাইসিস শেষে প্রকল্পে ৩২টি প্রাথমিক রুট এবং তার পরিপূরক হিসেবে ২৫টি চক্রাকার (ফিডার) রুটের একটি যৌক্তিকীকৃত নেটওয়ার্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। 

বর্তমানে ঢাকায় প্রায় ৭,০০০–৭,৫০০টি বাস চলাচল করে এবং প্রতিদিন আনুমানিক ৩৭–৩৮ লক্ষ যাত্রী বাসে যাতায়াত করেন—বহু-মালিকানাধীন, খণ্ডিত ও ব্যাপকভাবে পুনরাবৃত্ত এই নেটওয়ার্ককেই কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনার আওতায় পুনর্বিন্যাস করাই রেশনালাইজেশন কার্যক্রমের লক্ষ্য।

গণপরিবহনে স্মার্ট কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে
সভায় ডিটিসিএ 'র‌্যাপিড পাস (One Card for All Transport)' কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে, যার লক্ষ্য সকল ধরনের গণপরিবহনে একটিমাত্র স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ক্যাশলেস ও সমন্বিত ভাড়া পরিশোধ নিশ্চিত করা। বর্তমানে ১৯ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি যাত্রী স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করছেন এবং শুধু মেট্রোরেলেই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৭০ লাখ ট্রিপ সম্পন্ন হচ্ছে। এ পর্যন্ত কার্ডে ৬৮৫ কোটি টাকার বেশি রিচার্জ এবং প্রায় ৬৩৭.১৭ কোটি টাকা ভাড়া আদায় হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মেট্রোরেলের ৬৫.৭৩ শতাংশ যাত্রী র‌্যাপিড পাস বা এমআরটি পাস ব্যবহার করেছেন। মেট্রোরেল ও বাসে ভাড়া আদায় কার্যক্রম ডিটিসিএ-এর ক্লিয়ারিং হাউজের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া অনলাইন রিচার্জ সেবাও বর্তমানে চালু রয়েছে।

ঢাকায় নামানো হবে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস
সভায় জানানো হয়, নগরীর বাস খাত আধুনিকীকরণ ও বায়ুর গুণগত মান উন্নয়নের ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’ (বিসিএপি) ফেজ ১: কম্পোনেন্ট ২.২ (ঢাকা বাস মডার্নাইজেশন প্রোগ্রাম-ডিবিএমপি)-এর আওতায় ঢাকা শহরে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ডিটিসিএ। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের আনুমানিক মোট ব্যয় ২,৪৮,১৯৭.৫১ লক্ষ টাকা, যার মধ্যে বিশ্বব্যাংকের (আইডিএ) ১৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ রয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া এই প্রকল্পে রাজধানীতে ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক ও কোম্পানি-পরিচালিত ইলেকট্রিক বাস ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে, যা পরিবহন খাত থেকে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পাশাপাশি সেবার মান বৃদ্ধি করবে।

সভায় গাবতলী, কমলাপুর ও এয়ারপোর্টে মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট হাব গড়ে তোলার বিষেয়ে আলোচনা হয়, যেখানে মেট্রো, বাস, রেল, নৌ ও বিমান—একাধিক পরিবহন মাধ্যমকে সমন্বিত করে যাত্রীদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন স্থানান্তর নিশ্চিত করা হবে।
 
সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, একটি আন্তঃসংযুক্ত স্মার্ট-টিকিটিং ব্যবস্থার সঙ্গে এই হাবগুলোই দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিকল্পনাটিকে প্রকৃত অর্থে 'মাল্টিমোডাল' রূপ দেবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে ডিটিসিএ-কে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার গুরুত্ব সভায় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়, যার মধ্যে রয়েছে মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ এবং অধিকতর কার্যকর সমন্বয়ের স্বার্থে ডিটিসিএ-কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত করা।
 
এছাড়া কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (২০২৬–২০৪৫)-এর মন্ত্রিসভা কর্তৃক অনুমোদন ও গেজেট প্রকাশ, মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট অথরিটি আইন, ২০২৬-এর নীতিগত অনুমোদন এবং বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট -এর দ্রুত অনুমোদনকে ডিটিসিএ-এর অগ্রাধিকারভুক্ত করণীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

সভায় জানানো হয়, একটি বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে আধুনিক, সমন্বিত ও যাত্রীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা অপরিহার্য এবং নির্ধারিত সময়ে মাল্টিমোডাল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থাকে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার পূরণে যানজট নিরসন, গণপরিবহন সম্প্রসারণ ও পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকারও সভায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়। বিশেষ অতিথিগণ উদ্যোগটিকে স্বাগত জানিয়ে যথাসময়ে বাস্তবায়নে অব্যাহত সহযোগিতার আশ্বাস দেন। 

সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) বিজন কান্তি সরকার, সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তার, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, সেতু বিভাগ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ এবং পুলিশ কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিটিসিএ-এর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান। এ ছাড়াও মন্ত্রণালয়, ডিটিসিএ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সভায় অংশগ্রহণ করেন।

—জা.অর্থনীতি/আইবিএম