অনিদ্রা থেকে গুরুতর রোগ: কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলায় রাতে নিখোঁজ হওয়া এক নারীকে গাছের মগডাল থেকে উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। মানসিকভাবে অসুস্থ ওই নারী কীভাবে এত উঁচুতে উঠলেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা জল্পনা-কল্পনা ও ভূত-প্রেত সংক্রান্ত কুসংস্কারের জন্ম দিলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান এটিকে সম্পূর্ণ বাস্তব বলে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশ স্লিপ সার্জনস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মনিলাল আইচ লিটুর মতে, এটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা হলেও অসম্ভব নয়। মানুষের ঘুমের তীব্র ব্যাঘাত বা বিকৃতি ঘটলে অবচেতন অবস্থায় গাছে ওঠা, দেয়াল টপকানো বা চা বানানোর মতো বিপজ্জনক কাজ করা স্বাভাবিক এবং পরদিন সকালে রোগীর এসব ঘটনার কিছুই মনে থাকে না।

মনোবিদ ও ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনাকে 'স্লিপ ওয়াকিং' বা ঘুমের মধ্যে হাঁটা বলা হয়। মানুষের ঘুমের নন-র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট পর্যায়ের গভীর ধাপে সাধারণত এই সমস্যাটি দেখা যায়। তীব্র ঘুমের ঘাটতি, শ্বাসকষ্ট, রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম, পিটিএসডি, নাইট টেরর, অ্যালকোহল বা নির্দিষ্ট ঔষধের প্রভাবে মানুষ এই অবস্থায় উপনীত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র মায়োক্লিনিকের তথ্যানুযায়ী, ঘুমের ঘোরে মানুষ পোশাক পরা, খাওয়া, গাড়ি চালানো, এমনকি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মতো কাজও করতে পারে। এ সময় সিঁড়ি থেকে পড়ে বা জানালা দিয়ে লাফিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে এবং হঠাৎ ঘুম ভাঙলে এরা অনেক সময় বিভ্রান্ত বা সাময়িকভাবে হিংস্র আচরণ করতে পারে।

নিয়মিত ও সঠিক মাত্রায় ঘুম না হলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, কম ঘুমের কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও স্থূলতার মতো দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা দেখা দেয়। ঘুমের আরেকটি মারাত্মক সমস্যা হলো 'স্লিপ অ্যাপনিয়া', যেখানে ঘুমানোর সময় সাময়িকভাবে শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় এবং শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা ঘুমের মধ্যে দম বন্ধ হয়ে বা ঝাঁকুনি দিয়ে জেগে ওঠেন, তাদের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় এবং সারাদিন ক্লান্তিবোধ ও ঝিমুনি অনুভব করেন। দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবে এটি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্লিপ অ্যাপনিয়া বা ঘুমের অন্যান্য ব্যাধি ধরা পড়লে তা সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তবে দীর্ঘ অবহেলায় এটি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। যদি সপ্তাহে এক-দুইবারের বেশি বা এক রাতে কয়েকবার ঘুমের মধ্যে হাঁটার ঘটনা ঘটে এবং তা নিজের বা অন্যের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। বিশেষ করে, কোনো শিশুর এই সমস্যা কৈশোর পর্যন্ত গড়ালে অথবা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় প্রথমবারের মতো কেউ স্লিপ ওয়াকিংয়ের শিকার হলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
জেএ/অভি