ড. এন এম সাজ্জাদুল হক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট এবং বেলজিয়ামের সাউথ এশিয়া ফোরামের যৌথ সহযোগিতায় পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি কেয়ার, ব্রিটিশ কাউন্সিল, কারিতাস বাংলাদেশ, ডিএফআইডি, ইউকের অধীনে একাধিক জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেছেন। এছাড়া যুব উন্নয়ন নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তিনি সাউথ এশিয়া ইয়ুথ ফর পিস অ্যান্ড প্রসপারিটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে হত্যা, সহিংসতা, নিখোঁজ ও পারিবারিক বিরোধ থেকে প্রাণহানি, হত্যা, ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতাসহ নানা বিষয়ে সম্প্রতি সময়ে তিনি কথা বলেছেন জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দিদারুল হক
জাতীয় অর্থনীতি: পারিবারিক ও দাম্পত্য বিরোধ অনেক সময় সহিংসতা এমনকি হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। পারিবারিক সহিংসতার ঝুঁকি আগে থেকে শনাক্ত করা ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার দুর্বলতা কোথায়?
ড. সাজ্জাদ: আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার মূল সমস্যাটি অনেকটা একই জায়গায়— দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার ঘাটতি। সাম্প্রতিক সময়ে একজন আইনপ্রণেতার বাসা থেকে তার স্ত্রীর লাশ উদ্ধারের মতো অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা আমরা দেখেছি। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। তবে এ ধরনের ঘটনা সমাজে দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে।
কারণ একজন আইনপ্রণেতা বা সমাজের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তি যদি নিজের আচরণে দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যায়। ধর্মীয় পরিচয় বা বাহ্যিক পোশাকেরও তখন কোনো মূল্য থাকে না, যদি তা ব্যক্তির আচরণে নৈতিকতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন না ঘটায়। শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানও তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে, যদি তা একজন মানুষকে দায়িত্বশীল ও নৈতিক করে তুলতে না পারে।
পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করলেই একজন স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব শেষ হয় না; আচরণ ও মূল্যবোধের মধ্যেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে।
এগুলো একদিনে তৈরি হওয়া সমস্যা নয়। তাই প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোকে আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং বাস্তব জীবনেও এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
জাতীয় অর্থনীতি: শিশু নিখোঁজ, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের মধ্যে সমন্বিত শিশু সুরক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর? এ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে কী করা দরকার?
ড. সাজ্জাদ: শিশু সুরক্ষার বিষয়টি আমাদের আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। দেশে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে। এই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের গতি ও পরিধি আরও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত শিশু সুরক্ষার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলের মতো শিশু নির্যাতনবিরোধী বিশেষ সেলও গঠন করা যেতে পারে। এসব সেলকে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে হবে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কোনো ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত শনাক্ত, প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা যায়।
বিশেষ করে কন্যাশিশুরা নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তারা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার পাশাপাশি পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধেরও শিকার হচ্ছে। তাই শিশুদের সুরক্ষায় স্থানীয় পর্যায় থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ডিজিটাল যুগের বাস্তবতায় শিশু সুরক্ষার জন্য সহজলভ্য অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। সেখানে শুধু শিশুই নয়, বাবা-মা বা অভিভাবকরাও অভিযোগ জানাতে পারবেন। অভিযোগ গ্রহণের পর সেটির দ্রুত নিষ্পত্তি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে।
একইসঙ্গে অভিভাবকদের দায়িত্ব ও সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান যান্ত্রিক জীবনে বাবা-মা উভয়েই চাকরিজীবী হতে পারেন, একজন চাকরিজীবী হতে পারেন কিংবা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু এসব পরিস্থিতির মধ্যেও সন্তানের প্রতি অভিভাবকের যে দায়িত্ব রয়েছে, সে বিষয়ে গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিশুদেরও তাদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ঝুঁকির বিষয়ে বয়সোপযোগী সচেতন করে তুলতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও এ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে। কোনো শিশু নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে তার কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের থাকতে হবে। কেন শিশুটি স্কুলে আসছে না, সে কোনো ঝুঁকির মধ্যে আছে কি না— এসব বিষয়ে শিক্ষককে খোঁজ নিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে শুরু করে জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিশু সুরক্ষাকে গতানুগতিক কোনো উদ্যোগ হিসেবে দেখলে হবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, সমাজকল্যাণ, নারী ও শিশুবিষয়ক কার্যক্রমসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানের কী দায়িত্ব, কোথায় কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটলে কার কাছে অভিযোগ যাবে এবং কে তার সমাধান করবে— এসব বিষয় স্পষ্ট করে একটি সমন্বিত ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা প্রয়োজন।
জাতীয় অর্থনীতি: শিশুরা অনলাইন ও অফলাইন— দুই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। শিশু নির্যাতন, অপহরণ ও নিখোঁজের ঝুঁকি কমাতে পরিবার ও রাষ্ট্রের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব কী হওয়া উচিত?
ড. সাজ্জাদ: এখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিভিন্ন কমিটির সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক— অনেক ক্ষেত্রেই তারাই এখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছেন। বিভিন্ন ঘটনা ও অনিয়মের মধ্য দিয়ে আমরা এর প্রমাণও দেখতে পাচ্ছি।
আমি মনে করি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রথমত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে— এটি স্থানীয় পর্যায়েই হোক কিংবা কেন্দ্রীয়ভাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ— বিশেষ করে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব যেন শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নৈতিকতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনৈতিকতার সামান্যতম অভিযোগও থাকলে সেটি যথাযথভাবে যাচাই না করে তাকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়। একইসঙ্গে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সুস্পষ্ট নৈতিক ও পেশাগত সীমারেখা থাকা দরকার। যেমন, একজন শিক্ষক তার নিজের ক্লাসের শিক্ষার্থীকে ব্যক্তিগতভাবে পড়াচ্ছেন— এখান থেকেও স্বার্থের সংঘাত ও অনৈতিকতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি, বিদ্যালয়ে ঢোকার পর অ্যাসেম্বলি হতো, জাতীয় সংগীত গাওয়া হতো। এর মধ্য দিয়ে শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হতো না; বরং শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক সম্মান ও জাতীয়তাবোধের মতো মূল্যবোধও গড়ে উঠত। এ ধরনের ইতিবাচক চর্চাকে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতিতে আবারও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
এ উদ্যোগ শুধু স্কুলে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। মাদ্রাসা, কিন্ডারগার্টেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই এর আওতায় আনতে হবে। কারণ শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা, নৈতিক বিকাশ এবং একটি দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরনভেদে আলাদা হতে পারে না।
জাতীয় অর্থনীতি: আইনশৃঙ্খলা, পারিবারিক সহিংসতা, শিশু সুরক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা—এই বিষয়গুলোকে আলাদা করে দেখলে কি সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়? এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সমন্বিত নীতিকৌশল কেমন হওয়া প্রয়োজন?
ড. সাজ্জাদ: আপনি যে বিষয়গুলো এতক্ষণ উত্থাপন করেছেন এবং সর্বশেষ যে প্রশ্নটি করেছেন, প্রতিটি বিষয়কে যদি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করেন, তাহলে দেখবেন— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এই সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আমার মনে হয়, এমন একটি কার্যকর জবাবদিহিতার চক্র তৈরি করতে হবে, যেখানে দায়িত্বশীল ব্যক্তি তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা নীতি-নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত হলে স্বাভাবিকভাবেই তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আসতে হবে এবং প্রয়োজন হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে যোগ্য, সৎ ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটাই এমন হতে হবে, যেখানে ভালো কাজের স্বীকৃতি থাকবে এবং অনৈতিক কাজের পরিণতি নিশ্চিত হবে।
এই ধরনের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করা গেলে দুর্নীতি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রবণতাও অনেকাংশে কমে আসবে। কারণ মানুষ তখন বুঝবে— কোনো অনিয়ম করে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।
আমি একটি সাধারণ উদাহরণ দিতে চাই। বিষয়টি হয়তো কারও কাছে রাজনৈতিক মনে হতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী দিক রয়েছে। ধরুন, প্রধানমন্ত্রীর দৈনন্দিন জীবনযাপন, এমনকি তিনি কীভাবে সাধারণ ও সাশ্রয়ীভাবে খাবার গ্রহণ করেন— এ ধরনের বিষয়ও কখনও কখনও সংবাদে আসে। বাস্তবে একজন প্রধানমন্ত্রী কী খাচ্ছেন, সেটি হয়তো নিজে থেকে বড় কোনো সংবাদ নয়। কিন্তু এর একটি প্রতীকী মূল্য আছে।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন ব্যক্তি যদি মিতব্যয়ী জীবনযাপন করেন, অপচয় পরিহার করেন, সাধারণভাবে চলেন— তাহলে সেটি সমাজের অন্যদের জন্যও একটি বার্তা তৈরি করে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু, একজন মাধ্যমিক শিক্ষার্থী কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও তখন ভাবতে পারে—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে যদি মিতব্যয়িতা ও দায়িত্বশীলতার চর্চা থাকে, তাহলে আমিও কেন অপচয় করব?
আমার কাছে মূল বিষয়টি এখানেই— শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না; আইন, প্রতিষ্ঠান, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং জবাবদিহিতাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এই কাঠামো কার্যকর করা গেলে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের বিচ্ছিন্ন সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর সমাধানের পথে আসবে।
জাতীয় অর্থনীতি: নিখোঁজের ঘটনায় প্রথম কয়েক ঘণ্টা তদন্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত উদ্যোগ নেয়না কেন?
ড. সাজ্জাদ: নিখোঁজের ঘটনাকে কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তবতা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে বাসা থেকে অভিমান করে শিশু বা কিশোর-কিশোরী চলে যায়, আত্মীয়ের বাড়িতে যায় কিংবা কাউকে না জানিয়ে অন্য কোথাও অবস্থান করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খোঁজ নিয়ে তাদের উদ্ধার করে। কিন্তু এ ধরনের কিছু ঘটনা আছে, যেখানে নিখোঁজ হওয়ার পর আর তাদের জীবিত অবস্থায় পাওয়া যায় না। পরবর্তী সময়ে তাদের লাশ উদ্ধার হয় কিংবা তারা হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানা যায়। ফলে কোনো নিখোঁজের ঘটনাকে শুরুতেই ‘হয়তো নিজে থেকেই চলে গেছে’—এমন ধারণা থেকে দেখার সুযোগ নেই।
কুমিল্লার সাম্প্রতিক ঘটনাসহ অতীতে নিখোঁজ হওয়ার পর যেসব ঘটনায় গুরুতর পরিণতি ঘটেছে, সেগুলো থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শিক্ষা নিতে হবে। কেউ নিখোঁজ হয়েছে— এই তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করতে হবে। ‘পরে পাওয়া যাবে’, ‘নিজে থেকেই হয়তো ফিরে আসবে’ কিংবা ‘আগে অন্য ঘটনাটি দেখি, পরে এটিতে যাব’— এ ধরনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা বা প্রথম সময়টুকু অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে নিখোঁজের ঘটনা অনুসন্ধানে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো প্রয়োজন। কোনো শিশু বা কিশোর কোথা থেকে নিখোঁজ হয়েছে, সর্বশেষ কোথায় দেখা গেছে, কোন পথে গেছে— এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য গতিপথ চিহ্নিত করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল তথ্য কাজে লাগানোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অপ্রতিমের ঘটনাতেও সে যে এলাকায় গিয়ে পৌঁছেছিল, সেই এলাকাটি আমাদের অনুসন্ধান ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র হতে পারে। এ ধরনের তথ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিত অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার।
অর্থাৎ নিখোঁজের ঘটনা মোকাবিলায় আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। পরিবার দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানাবে, আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অভিযোগ পাওয়ার পর সেটিকে ‘সাধারণ নিখোঁজ’ হিসেবে না দেখে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দিয়ে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধানে যাবে— এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে আসাই হতে পারে পরবর্তী গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।