শেফার্ডের বর্জ্যে দূষিত খিরু নদী, ব্যাহত হাজার একর জমির আবাদ
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি: আদ্যিকালের জনশ্রুতিতে প্রচলিত ছিল, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলা ও গাজীপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খিরু নদীতে যেন দুধের নহর বয়।  নদীর পানি খিরের (গুড়ের পায়েস) মতো সুস্বাদু ছিল বলে নদীটির নামকরণ হয়েছিল খিরু। দিনমানের কাজ, কৃষি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য এই নদীর ওপরই নির্ভর করতেন এই অঞ্চলের মানুষ।  কিন্তু এখন এই নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতেই যেন ভয় হয়, নিঃশ্বাস নিতেই লাগে অস্বস্তি- এমনটাই জানান ছোট এই নদীটির পাড়ের মানুষ। 

নদীর কুচকুচে কালো দুর্গন্ধযুক্ত পানি শরীরে লাগলে ঘা হয়। জমিতে দিলে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। দুর্গন্ধে আশপাশের মানুষ অতিষ্ঠ। মাছশূন্য নদী। পানিতে ব্যাঙ লাফ দিয়ে পড়লেও মরে ভেসে ওঠে। এক সময়ের প্রশস্ত নদীর অবস্থা এখন নর্দমার জীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা শুধু খিরু নদীই নয়; ভালুকার লাউতি, বিলাইঝুড়ি, মরাপুরাসহ কয়েকটি খাল ও বিলের মোটামুটি একই দশা।

ময়মনসিংহের এককালের ঐতিহ্যের জনপদ ভালুকা এখন এক শিল্পনগরী। নদীর পাড়ে শতাধিক কারখানা থাকলেও মাত্র ৩১টি কারখানায় রাসায়নিক বর্জ্য পরিশোধনের ‘ইটিপি’ আছে। বাকী কারখানাগুলো অপরিশোধিত বর্জ্যই নদীতে ফেলে। তাছাড়া বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নাই কারখানাগুলোতে। অভিযোগ আছে, ইটিপি আছে এমন কারখানাগুলোও অপরিশোধিত বর্জ্য ফেলার কৌশল হিসেবে আরেকটি গোপন পাইপ ব্যবহার করে। প্রশাসনের চোখ এড়াতে বিকেল পাঁচটার পরে এই পাইপও আবার খুলে দেওয়া হয়। এই সময় কারখানা থেকে বের হওয়া পানি ও বর্জ্যের দুর্গন্ধে এলাকার কাছাকাছি রাস্তা ও বসবাসকারী গ্রামে অবস্থান করা কঠিন হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভালুকার খিরু নদীর পাড়ের কারখানাগুলোর মধ্যে শেফার্ড গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ফ্যাক্টরিগুলো নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ তুঙ্গে।  প্রতিবেদকের কাছে স্থানীয় কৃষক ও পরিবেশকর্মীরা জানিয়েছেন, শেফার্ডের কারখানার বর্জ্য নদীতে পড়ায় নদীর নাব্যতা কমছে এবং প্রায় ২৫ কিলোমিটার নদীপাড়ের সেচনির্ভর হাজার হাজার একর আমন ও বোরো জমির আবাদ ব্যাহত হচ্ছে। দূষিত পানির কারণে নদী ও আশপাশের জলাশয়ের মাছসহ জলজ প্রাণীর উপস্থিতিও কমে গেছে। একই সঙ্গে দুর্গন্ধ ও দূষিত পানির কারণে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শেফার্ডের কারখানার পাশে গিয়ে দেখা যায়, খিরু নদীর বিভিন্ন অংশের পানির রং কালচে হয়ে গেছে। নদীর পাড়ে গেলে রাসায়নিক বর্জ্যের তীব্র গন্ধ পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পকারখানার বর্জ্য পড়তে থাকায় নদীর পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। 

স্থানীয় কৃষকেরা জানান, শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানির সংকট থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে নদীর দূষিত পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করেন। এতে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর পানিতে মাছ তো নেই-ই, ব্যাঙসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর উপস্থিতিও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে বলে স্থানীয়রা জানান।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, ভালুকায় প্রায় ৩০টি ড্রাইং কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার অনেকগুলো ইটিপি ব্যবহার না করে তরল শিল্পবর্জ্য বিভিন্ন খাল হয়ে খিরু নদীতে ফেলছে। এর ফলে লাউতি খাল, বিলাইঝুড়ি খালসহ প্রায় ৩০টি খালও দূষিত হয়ে পড়েছে। 

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) ভালুকা আঞ্চলিক শাখার সদস্যসচিব কামরুল হাসান পাঠান বলেন, ‘শিল্পবর্জ্যের কারণে খিরু নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তার ভাষ্য, শেফার্ড ফ্যাক্টরিসহ বিভিন্ন কারখানার তরল বর্জ্য নদীতে পড়ছে। এসব বর্জ্যে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক থাকায় জীববৈচিত্র্য, কৃষি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

কামরুল হাসান পাঠান আরও বলেন, ‘খিরু নদী রক্ষার দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে মানববন্ধন, প্রতিবাদ ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে। গত ১৪ মার্চ নদীকৃত্য দিবসেও মানববন্ধন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। তবে কার্যকর কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। ’তিনি প্রশ্ন তোলেন, একটা নদীকে প্রতিনিয়ত মেরে ফেলছে যে কারখানা, সেগুলো কীভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাচ্ছে এবং প্রতিবছর তা নবায়ন করছে?
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, শিল্পকারখানাগুলোতে ইটিপি স্থাপন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না। তাদের দাবি, প্রশাসন বা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শনের সময় পরিশোধিত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা দেখানো হলেও অন্য সময়ে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি জলাশয়ে ফেলার ঘটনা ঘটে। 

তবে এ বিষয়ে বারবার চেষ্টা করেও সংশ্লিষ্ট কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এর পাশাপাশি অবৈধ দখলও খিরু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিভিন্ন সময়ে দখল উচ্ছেদে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ীভাবে কার্যকর হয়নি বলে জানান তারা। 
পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়রা খিরু নদীর দূষণ বন্ধ, শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা এবং অবৈধ দখল উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, নদীটি রক্ষা করা না গেলে কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।