পাটখড়ি হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

নাটোর প্রতিনিধি: নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় পাটখড়ির ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। গ্রামীণ জীবনের মাটির চুলায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের পর একসময় এর বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক মূল্য ছিল না। তবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। পাটখড়ির বহুমুখী ব্যবহার ও বাণিজ্যিক চাহিদা বাড়ায় তা এখন কেবল জ্বালানি নয়, কৃষকের কাছে পাটের আঁশের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্যে পরিণত হয়েছে।

পটের বাজারদর নিয়ে কৃষকের প্রত্যাশা সব সময় পূরণ না হলেও, অনেক ক্ষেত্রে পাটের চেয়ে পাটখড়ি বিক্রি করেই বেশি লাভ পাচ্ছেন তারা। ফলে গত কয়েক বছর ধরে পাটখড়ির বাড়তি চাহিদা থাকায় কৃষকেরা নতুন করে পাট চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।

উপজেলার দ্বারীখৈল গ্রামের পাটচাষি মোতালেব হোসেন জানান, এক বিঘা জমিতে পাট চাষে কৃষকের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় পাটখড়ি উৎপাদন হয় ১৫ থেকে ২০ মন, যা প্রতি মন গড়ে ১,০০০ টাকায় বিক্রি হয়। পাটের আঁশ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে খুব বেশি লাভ থাকে না, তবে পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি আয় পাওয়া যায়।

আগে এটি মূলত জ্বালানির সহকারী হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এখন এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাড়ির বেড়া, গোয়ালঘর কিংবা অস্থায়ী ঘের তৈরিতে পাটখড়ি ব্যবহৃত হচ্ছে। সবজি বা অন্য কোনো ফসল পশুপাখির হাত থেকে রক্ষা করতেও কৃষকেরা জমির চারপাশে পাটখড়ির বেড়া দিচ্ছেন।

উপজেলার ধারোয়াইল গ্রামের কৃষক সাধু আলী জানান, পাটখড়ি শুকিয়ে সংরক্ষণ করা বেশ সহজ। মাঠ থেকে সংগ্রহের পর রাস্তার পাশে, মাঠে কিংবা বাড়ির উঠানে রোদে শুকিয়ে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে সংরক্ষণ করা হয়।

পাটখড়ির চাহিদা এখন আর গ্রামে সীমাবদ্ধ নেই। শহর-বন্দর ও বাজারে ফেরি করে ব্যবসায়ীরা পাটখড়ি বিক্রি করছেন। এতে কৃষকের উৎপাদিত পাটখড়ি সরাসরি গ্রামীণ বাজার ছাড়িয়ে শহরে পৌঁছে যাচ্ছে।

ব্যবসায়ী আলতাব হোসেন জানান, কৃষকের কাছ থেকে মানভেদে এক বিঘা জমির পাটখড়ি ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায় কেনা হয়। পরে ছোট ছোট আঁটি করে গ্রাম ও শহরে ফেরি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের মিল-কারখানায় এটি উচ্চ দামে বিক্রি হয়।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সজীব আল মারুফ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০,২২০ হেক্টর। চাষ হয়েছে ১০,৮৭৫ হেক্টর বা ৮১,২৩৬ বিঘায়। জমিভেদে প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মন পাটখড়ি উৎপাদিত হয়।

ডাইরেক্টর অব রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেল এবং বাউয়েট (বিশ্ববিদ্যালয়)-এর কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক ড. ছাইফুল ইসলাম জানান, পার্টিকেল বোর্ড, ফাইবারবোর্ড, কাগজ তৈরি, প্রিন্টার মেশিনের কালি, হস্তশিল্প ও পরিবেশবান্ধব নানা পণ্য তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে পাটখড়ির চাহিদা বাড়ছে। দেশে সংশ্লিষ্ট মিল-কারখানা আরও বিস্তৃত হলে কাঁচামাল হিসেবে এর গুরুত্ব বহুগুণ বাড়বে, পাটখড়ির বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবেন।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি