মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় থাকা চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ভাতার সরকারি টাকা আত্মসাৎ ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভাতা বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যাংক এশিয়ার স্থানীয় এজেন্ট ব্যাংকিং প্রতিনিধি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে এই প্রতারণার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী সাধারণ শ্রমিকেরা।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহি চা-বাগানের ৩০ জন ভুক্তভোগী চা-শ্রমিক যৌথ স্বাক্ষরে একটি লিখিত অভিযোগপত্র শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর জমা দেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সরকার প্রদত্ত চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ভাতার টাকা ব্যাংক এশিয়ার শ্রীমঙ্গল ভৈরবগঞ্জ শাখার মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছিল। তবে গত ২০ সেপ্টেম্বর ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে অনিয়মের শিকার হন শ্রমিকেরা। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিজন সুবিধাভোগী শ্রমিকের ৭ হাজার ৮০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও তাঁদের অর্ধেকেরও কম টাকা দেওয়া হয়। কাউকে ৩ হাজার, আবার কাউকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে বিদায় করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ, 'ডকুমেন্ট প্রসেসিং'-এর অজুহাতে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপিতে কৌশল ও প্রতারণার আশ্রয়ে টিপসই ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। টাকা প্রদানের রশিদে সম্পূর্ণ অঙ্কের উল্লেখ না রেখে আংশিক টাকা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদ জানালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রতিনিধি ও তাঁদের সহযোগীরা শ্রমিকদের সাথে চরম অশালীন আচরণ করেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ব্যাংকের হিসাব বিবরণী (স্টেটমেন্ট) পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে রাম কুমারি নুনিয়া, রাজু রায়, সবিতা কর্মকার ও সবিতা বাউরীর মতো অসংখ্য সাধারণ শ্রমিকের নামীয় ভাতা জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যাবে।
প্রতারণার শিকার মাজদিহি চা-বাগানের নারী শ্রমিক সন্তুকি রায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের মতো খেটে খাওয়া অসহায় চা-শ্রমিকদের বরাদ্দের টাকা এভাবে কেটে রাখা চরম অন্যায়। আমরা এই অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও আমাদের বকেয়া টাকা ফেরতের দাবি জানাচ্ছি।"
চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাবেক সভাপতি অনিল কর্মকার বলেন, "সরকার এই টাকা খেটে খাওয়া শ্রমিকদের উন্নয়নে দিয়েছে। এখানে কারো অবৈধভাবে ভাগ বসানোর কোনো সুযোগ নেই।"
অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংক এশিয়ার ভৈরববাজার এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে ব্যাংক এশিয়ার মৌলভীবাজার জেলা শাখা ব্যবস্থাপক তুহিন আহমদ জানান, "ঘটনাটি মৌখিকভাবে শুনেছি। তবে এখনো লিখিত অভিযোগ হাতে পাইনি। অনেকের ভাতার টাকা সরাসরি বিকাশ বা রকেটেও স্থানান্তরিত হয়ে থাকে, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।"
শ্রীমঙ্গল উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. সোয়েব হোসেন চৌধুরী জানান, চা-বাগানে সৃষ্টি হওয়া এই বিরোধ নিয়ে একটি সালিস বৈঠকের কথা তিনি শুনেছেন। দাপ্তরিকভাবে লিখিত অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান অভিযোগ প্রাপ্তির কথা নিশ্চিত করে বলেন, "চা-শ্রমিকদের ভাতার টাকা আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ পেয়েছি এবং বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। খুব শিগগিরই সরেজমিনে তদন্ত পরিচালনা করা হবে। নিরপেক্ষ তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সম্পৃক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
