জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: পরীক্ষা ছাড়াই পাস কিংবা যোগ্যতা ছাড়াই চাকরি- সমাজের সব জায়গায় যখন 'অটো' সংস্কৃতি জেঁকে বসেছে, তখন সড়কের 'অটোরিকশা' জন্ম দিয়েছে আরেক অদৃশ্য সাম্রাজ্যের! যেখানে সাধারণ গ্রাহক বিল দিয়েও লোডশেডিংয়ের কবলে পড়েন, সেখানে প্রতি রাতে লাখ লাখ ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে কার ক্ষমতায়? কার পকেটে যাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার এই অবৈধ বিদ্যুৎ বাণিজ্য?
দেশের প্রান্তিক যোগাযোগ ও লাখ লাখ নিম্নবিত্ত মানুষের রুটি-রুজির প্রশ্নে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে এটি এখন অন্যতম ভরসা।
কিন্তু কোনো খাত যখন নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বড় হয়, তখন তার দায় নিতে হয় পুরো রাষ্ট্রকে।
দেশে আনুমানিক ৬০ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা প্রতিদিন রাস্তায় নামে। একটি গাড়িতে ৪ থেকে ৬টি ভারী ব্যাটারি চার্জ করতে দৈনিক গড়ে ৮ থেকে ৯ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। এই বিপুল সংখ্যার প্রতিদিনের সামগ্রিক বিদ্যুৎ চাহিদা জাতীয় গ্রিডকে চরম চাপের মুখে ফেলছে।
বিদ্যুৎ যদি বৈধ বাণিজ্যিক মিটারে ব্যবহৃত হতো, তবে রাষ্ট্র পেত বিপুল রাজস্ব। কিন্তু বাস্তব চিত্র পুরো উল্টো।
অসংখ্য গ্যারেজে মেইন লাইন থেকে সরাসরি অবৈধ হুকিং করে সারারাত শত শত ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই গ্যারেজ ও চার্জিং ব্যবস্থাকে ঘিরে বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকার সমান্তরাল ও অনিবন্ধিত লেনদেন চলছে!
রাষ্ট্র কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অথচ লোকাল সিন্ডিকেট ও মধ্যস্বত্বভোগীরা হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। ডলার খরচ করে আমদানি করা জ্বালানি দিয়ে তৈরি বিদ্যুৎ যখন এভাবে চুরি হয়, তার ক্ষতিপূরণ ও ভর্তুকির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ করদাতার ঘাড়েই চাপে।
লাখ লাখ মানুষের রুটি-রুজি জড়িত থাকায় এই যান রাতারাতি নিষিদ্ধ করা কোনো টেকসই সমাধান নয়। বরং প্রয়োজন নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো:
প্রথমত, প্রতিটি অটোরিকশার সুনির্দিষ্ট ডেটাবেজ, চালকের লাইসেন্স ও ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, সিএনজি বা পেট্রোল পাম্পের আদলে অনুমোদিত বাণিজ্যিক চার্জিং স্টেশন গড়ে তোলা। রাতের অফ-পিক আওয়ার কিংবা সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে চার্জিংয়ের ব্যবস্থা করলে গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং সরকার পাবে ন্যায্য রাজস্ব।
তৃতীয়ত, কেবল চুনোপুঁটি বা কর্মচারীদের নয়, বিদ্যুৎ চুরির সাথে জড়িত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও বিতরণ ব্যবস্থার অসাধু চক্রকে আইনের আওতায় আনা।
প্রশ্নটি অটোরিকশা বন্ধের নয়; প্রশ্নটি হলো- এই খাত কি বৈধ, করদায়ী ও নিরাপদ অর্থনীতির অংশ হবে, নাকি প্রভাবশালীদের অবৈধ বাণিজ্যের হাতিয়ার হয়ে থাকবে? দায়মুক্তির অনিয়ম ভেঙে রাষ্ট্রকে আইনের শাসন ও স্বচ্ছতায় ফিরতেই হবে।
অটোরিকশায় কার পকেটে যাচ্ছে ২১ হাজার কোটি টাকা?
আপনি নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল দিয়েও লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ছেন, অথচ প্রতি রাতে লাখ লাখ অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ হচ্ছে অবৈধ বিদ্যুৎ হুকিং দিয়ে! দেশে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশাকে কেন্দ্র করে বছরে ২১ হাজার কোটি টাকার সমান্তরাল ব্যবসা চলছে। রাষ্ট্র হারাচ্ছে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব, আর চুরির দায় এসে পড়ছে সাধারণ করদাতার ঘাড়ে! এই অনিয়ম আর কতদিন?
অটোরিকশা কি নিষিদ্ধ করা উচিত? আসল সমাধান কী?
লাখ লাখ চালকের জীবিকা জড়িত থাকায় অটোরিকশা নিষিদ্ধ করা সমাধান নয়। সমাধান হলো নিয়মে আনা! ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশন, পেট্রোল পাম্পের মতো অনুমোদিত সোলার বা অফ-পিক চার্জিং স্টেশন এবং বৈধ বাণিজ্যিক মিটার বসালে একদিকে বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ হবে, অন্যদিকে সরকার পাবে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব। আপনি কি মনে করেন অটোরিকশাকে দ্রুত বৈধ কাঠামোর মধ্যে আনা উচিত? কমেন্টে জানান!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
