দুই বছরে ১৬ লাখ শিক্ষার্থী কম, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে তারা!
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

দুই বছরে কমে গেছে ১৬ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী! প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েও মাধ্যমিক শিক্ষায় পৌঁছাতে পারছে না বিপুলসংখ্যক শিশু। কেউ পরিবারের অভাবের কারণে কাজে যোগ দিচ্ছে, কেউ আবার পড়াশোনার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে।

কিন্তু কেন ঘটছে এমন পরিস্থিতি? শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নাকি শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা-কোনটি দায়ী?

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো-ব্যানবেইসের ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের প্রাইমারি-পরবর্তী স্তরে শিক্ষার্থী ছিল ২ কোটি ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৬০ জন। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯১ জনে। ২০২৫ সালে আরও কমে হয় ১ কোটি ৮৭ লাখ ৩১ হাজার ১১২ জন।

অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৯৪৮ জন। হ্রাসের হার প্রায় ৮ দশমিক ১ শতাংশ।

শুধু মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই ২০২৩ সালে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ৯৪ লাখ ৫ হাজার। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারে। অর্থাৎ, দুই বছরে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার।

প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকে প্রবেশের হারও ধারাবাহিকভাবে ওঠানামা করছে। ২০১৯ সালে এ হার ছিল ৯৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ২০২০ সালে ৯৬ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৩ শতাংশে নামে। ২০২২ সালে তা নেমে আসে ৭৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে। ২০২৩ সালে বেড়ে ৮৩ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৮৪ দশমিক ২০ শতাংশ হলেও ২০২৫ সালে আবার কমে দাঁড়ায় ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার কমেছে ১৫ দশমিক ২৪ শতাংশীয় পয়েন্ট।

সিপিডির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী কমেছে ৭ শতাংশ। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে প্রাথমিক শেষ করা শিক্ষার্থীর সংখ্যার তুলনায় মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ২১ দশমিক ৫ শতাংশ কম ছিল।

গবেষণায় শিশুশ্রমের কারণে ঝরে পড়ার হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ এবং বাল্যবিবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঝরে পড়ার হার ৩৮ দশমিক ৯ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, ভর্তি কম হলেও ঝরে পড়ার হার বেশি। শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আগ্রহ বাড়াতে স্কুল ইউনিফর্ম এবং স্কুলে খাবার দেওয়ার উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, সফল পাইলট প্রকল্প পর্যায়ক্রমে সারা দেশে বাস্তবায়ন করা হবে। তার মতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার নগণ্য হলেও মাধ্যমিকে প্রবেশের সময় ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বর্তমানে ১৫০ উপজেলায় মিড ডে মিল চালু রয়েছে। আগামী বছর এটি সারা দেশে চালুর আশা করছেন তিনি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল থাকায় অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিকের পড়াশোনার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। পঞ্চম শ্রেণি শেষ করেও অনেকের শেখার মান দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির পর্যায়ে থাকে।

বিনামূল্যে বই দেওয়া হলেও খাতা-কলম, পোশাক, যাতায়াত ও খাবারের খরচ দরিদ্র পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করে। শিশুর উপার্জন বন্ধ হওয়ার আশঙ্কাও অভিভাবকদের সন্তানকে কাজে পাঠাতে উৎসাহিত করে।

শিক্ষকসংকট, শূন্য পদ পূরণে বিলম্ব, মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের ঘাটতি এবং পড়াশোনা শেষে কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তাও শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিক্ষা কমিশন গঠন ও সুস্পষ্ট নীতির ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ইসলামগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নিজাম উদ্দিন শেখ বলেছেন, তার এলাকায় অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির পর কওমি, হাফেজি বা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। তাই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষার্থী কমলেই সবাইকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থী বলা যায় না।

তবে আর্থিক সংকট, অভিভাবকের অসচেতনতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তিও পড়াশোনায় অনাগ্রহের কারণ হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

সব মিলিয়ে, প্রাথমিকের পর মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দারিদ্র্য, শিক্ষার ব্যয় ও দুর্বল শিক্ষার ভিত্তি কাটিয়ে ওঠা না গেলে এই সংকট আরও জটিল হতে পারে।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি