ব্যাংকে আমানতের চেয়ে বাইরে নগদ টাকা বাড়ছে দ্রুত

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ টাকা। গত আগস্ট শেষে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়েছে ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। একই সময়ে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতির চাপ, দৈনন্দিন লেনদেনে নগদের প্রয়োজন এবং কোনো কোনো ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থার ঘাটতিকে এ প্রবণতার সম্ভাব্য কারণ মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বেড়েছে ৪২ হাজার ৬০১ কোটি টাকা।

অন্যদিকে আগস্ট শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩৩ হাজার ১০১ কোটি টাকা। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ১৯ লাখ ৫ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। এক বছরে আমানত বেড়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। টাকার অঙ্কে আমানত বেশি বাড়লেও বৃদ্ধির হারে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা এগিয়ে রয়েছে ৩ দশমিক ৪৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এতে সংসারের খরচ মেটাতে নগদের চাহিদা বাড়তে পারে। পাশাপাশি নগদ লেনদেনের প্রচলন এবং কিছু ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকের উদ্বেগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু নগদ টাকা ও আমানতের প্রবৃদ্ধির তুলনা থেকে মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখার বদলে হাতে রাখছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে, আগস্ট শেষে ব্যাপক অর্থ সরবরাহ বা ব্রড মানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৪ লাখ ৫২ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়েছে ১২ দশমিক ৪০ শতাংশ। গত বছরের আগস্টে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

আমানতের ধরনভেদেও প্রবৃদ্ধিতে পার্থক্য রয়েছে। আগস্ট শেষে মেয়াদি আমানত বেড়েছে ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে চলতি আমানত বেড়েছে ৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ।

জীবনযাত্রার ব্যয় ও আমানতের সুদহারও সঞ্চয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয় ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, জুলাইয়ে আমানতের গড় ভারিত সুদহার ছিল ৬ দশমিক ২১ শতাংশ। ভিন্ন মাসের তথ্য হলেও এতে মূল্যস্ফীতির তুলনায় আমানতের গড় সুদহার কম থাকার চিত্র পাওয়া যায়।

ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকা বাড়লেও শুধু এ তথ্য থেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সামগ্রিক তারল্যসংকটের সিদ্ধান্ত টানা যায় না। আগস্ট শেষে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মোট তরল সম্পদ ছিল ৭ লাখ ৮১ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তারল্য ছিল ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিক হিসাব দিয়ে পৃথক ব্যাংকের তারল্য পরিস্থিতি বোঝা যায় না। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

নগদনির্ভর লেনদেনের সঙ্গে অর্থনীতির ব্যয় ও রাজস্ব আদায়ের বিষয়ও জড়িত। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট’ শীর্ষক গবেষণায় নগদনির্ভর অর্থনীতির বার্ষিক মোট ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৭০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এটি জিডিপির ৩ দশমিক ২৪ শতাংশের সমান। এর মধ্যে নগদ লেনদেনসংশ্লিষ্ট অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির প্রাক্কলন ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা।

গবেষণায় নগদ অর্থ ছাপানো, পরিবহন, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ব্যাংক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা কিউআরের মতো ব্যবস্থায় ব্যাংক হিসাব কিংবা সমর্থিত আর্থিক সেবার অ্যাপ ব্যবহার করে পণ্য ও সেবার মূল্য পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।