সৈয়দ ইকবাল ও শেখ সাদী, ঢাকা: রাজধানীর গুলিস্তানে পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের জায়গায় জায়গায় নির্মাণাধীন বহুতল মার্কেট ভবন নির্মাণ নিয়ে আপত্তি তুলেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সরকারি সংস্থাটির ভাষ্য, রেলওয়ের জমি লিজ বা ভাড়া নিয়ে সেখানে অস্থায়ী মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু লিজ নেওয়া সম্পত্তির ওপর স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা আইনত সিদ্ধ নয়। এজন্য ভবন নির্মাণ বন্ধ রাখার আহবান জানিয়েছে রেলওয়ে। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে (ডিএসসিসি) দুই দফা চিঠি দেওয়া হলেও জবাব না দেওয়ায় আইনি পদক্ষেপের কথা ভাবছে রেল কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় অর্থনীতির হাতে আসা চিঠি থেকে জানা যায়, সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ডিএসসিসিকে চিঠি দেওয়া হয়। রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহার স্বাক্ষরিত (উপসচিব) ওই চিঠিতে রেলওয়ের মালিকানাধীন ভূমিতে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ
করার আহবান জানানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, ঢাকা জেলাধীন ৭নং রমনা মৌজার সিটি জরিপ খতিয়ান নং-১১ এর সিটি জরিপ-৬৯১২নং দাগের ১ দশমিক ৬৫ একর রেলভূমিতে অবৈধভাবে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধকরণ ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রেলপথ মন্ত্রণালয় হতে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, পুলিশ হেড কোয়ার্টারের পশ্চিম পার্শ্বে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন জমিতে বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর বন্ধ আছে। সেখানে ডিএসসিসি বহুতল মার্কেট নির্মাণ করছে। আইন অনুযায়ী, ভাড়া নেওয়া জমিতে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ আইনসিদ্ধ না হওয়ায় তা বন্ধ রাখার আহবান জানানো হয়। গত বছরের ১৫ জুলাই মাসেও রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. জিয়াউল হক স্বাক্ষরিত চিঠিতে একই বিষয় উল্লেখ করে ডিএসসিকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল।
এই চিঠি দুটির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা শিমুল কুমার সাহা জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ডিএসসিসিতে দেওয়া দুটি চিঠির কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব এখনও পায়নি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নিয়মিত প্রক্রিয়ায় সামনে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ১৯৮৯ সালে গুলিস্তান হকার্স মার্কেট, বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট, মহানগরী মার্কেট ও আদর্শ মার্কেট নিয়ে গড়ে ওঠে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স। টিন ও কাঠের তৈরি অস্থায়ী কাঠামোতে ছিল ৩ হাজার ১৬১টি দোকান। সেখানে পোশাকের পাশাপাশি দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসও বিক্রি হতো। একসময় খুচরা মার্কেট হিসেবে জনপ্রিয় হলেও পরে পাইকারি বিক্রির জন্য পরিচিত হয় মার্কেটটি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল মার্কেটটি আগুনে পুড়ে যায়। পরের বছর ৪ জুন সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। তখন বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো আপত্তি তোলেনি। তবে আগস্টে সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তোলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এতদিন নির্মাণকাজ চলার পর নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে শিমুল কুমার সাহা বলেন, 'আসলে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এটার কোনো সম্পর্ক নেই। সরকারি কাজ তার নিয়মেই চলে। তবে আগে কেন এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, আমার জানা নেই। আমি তো তখন ছিলাম না।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকার ফুলবাড়িয়া বাংলাদেশ রেলের মালিকানাধীন স্থানে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক আদেশের মাধ্যমে রেলের জমি সিটি করপোরেশনকে দখল হস্তান্তর করেন। বিনিময়ে রেলকে ৫ শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত সিটি করপোরেশন তা দেয়নি। রেল কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে জমি দিয়েছে 'এমন শক্ত দালিলিক প্রমাণ কোথাও নেই' বলেও মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জহিরুল ইসলাম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, 'রেলওয়ে অনেক জায়গা জনস্বার্থে সিটি করপোরেশনকে হস্তান্তর করেছে। তবে অনেক জায়গায় রেকর্ডজনিত সমস্যা রয়ে গেছে। বিগত দিনে এসব জায়গার রেকর্ড ঠিক করার পদক্ষেপ ছিল না। সে জন্যই নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন এমন অনেক জায়গা আছে, যেটা রাষ্ট্র ও জনস্বার্থে আমরা সিটি করপোরেশনও ছেড়ে দেই। যেমন এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য ডিএসসিসি অনেক জায়গা ছেড়েছে। আবার ফুটপাথে বসা হকারদের পুনর্বাসনের জন্যও আমাদের অনেক ইজারাকৃত সম্পত্তি ছাড়তে হচ্ছে। বিষয়টা হচ্ছে রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে।
রেলওয়ের জমিতে স্থায়ী ভবন নির্মাণের আইনি বিষয়ের সরাসরি জবাব না দিয়ে তিনি বলেন, 'এতদিন পর কেন বিষয়টি নিয়ে আপত্তি তুলে চিঠি দিয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। এই বঙ্গবাজার অনেক বছর আগে থেকেই মার্কেট ছিল। এই মার্কেট তো হুট করে হয়নি। ডিএসসিসি এটাকে স্থায়ী একটা সমাধান এবং জনস্বার্থের বিবেচনায় বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে আলোচনার মাধ্যমে এমন জটিল বিষয়গুলোর সমাধান করা হবে। যেভাবে সুন্দর ও জনবান্ধব হবে আমরা সেই আলোচনার মাধ্যমেই এটি সমাধানের উদ্যোগ নিব।'
এদিকে রেলওয়ের ভূসম্পত্তি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২০-এর গেজেটে বলা হয়েছে, লিজ নেওয়া জমিতে কোনো পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা যায় না, এটি সাধারণত সেমিপাকা বা অস্থায়ী ব্যবহারের জন্য। রেলওয়ের নিজস্ব প্রয়োজনে যে কোনো সময় এক মাসের নোটিশে লিজ বাতিল করে জমি ফেরত নিতে পারে। একইসঙ্গে লিজ গ্রহীতাকে জমির মূল গেজেট ও নথিপত্র অনুসারে শর্ত মেনে চলতে হয়।
ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজারকে আধুনিক রূপদান এবং সেখানে ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগের বিষয়টি মাথায় নিয়ে বহুতল ভবন তৈরির উদ্যোগ নেয় তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ২৫ মে ৩৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মার্কেট ভবন নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বঙ্গবাজারের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান'। ১০ তলা ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও বেজমেন্ট ছাড়াও থাকবে মোট আটটি ফ্লোর। ১ দশমিক ৭৯ একর জায়গার ওপর নির্মিত হতে যাওয়া বহুতল ভবনে থাকবে ৩ হাজার ৪২টি দোকান। প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১০০ স্কয়ার ফুট।
ভবনটিতে থাকবে আটটি লিফট। এর মধ্যে চারটি থাকবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য। আর বাকি চারটি কার্গো লিফট থাকবে মালামাল ওঠা-নামানোর জন্য। ভবনের গ্রাউন্ড ফ্লোর ও বেজমেন্ট ছাড়াও থাকবে মোট আটটি ফ্লোর। এছাড়া থাকছে গাড়ি পার্কিং, খাবারের দোকান, সমিতির অফিস, নিরাপত্তাকর্মী এবং সেখানকার কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা। ২০২৮ সালের মধ্যে মার্কেটটির কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ডিএসসিসি সূত্রে জানা যায়। সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে বেজমেন্টের কাজ সম্পন্ন হয়ে দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলছে।
বঙ্গবাজার মার্কেটটি মূলত বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স, আদর্শ ইউনিট, মহানগর ইউনিট ও গুলিস্তান ইউনিট নিয়ে গঠিত ছিল। অগ্নিকাণ্ডে ৩ হাজার ৮৪৫ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন। প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৩০৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
ঢাকার ইতিহাসের নানা নথিপত্র থেকে জানা যায়, ১৯৬৫ সাল নাগাদ ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল একটি ভাসমান বাজার যা পরবর্তীতে বঙ্গবাজার নাম হয়। তখন হকাররা রেলযাত্রীদের জন্য নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসতেন সেখানে। ১৯৬৮ সালে ফুলবাড়িয়া বন্ধ হয়ে চালু হয় কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। তবে ফুলবাড়িয়া পাকাপাকিভাবে বন্ধ হলেও হকারদের অস্থায়ী সেই বাজার আর বন্ধ হয়নি। বঙ্গবাজার কালক্রমে রূপ নেয় দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি কাপড়ের মার্কেটে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ের বিভিন্ন জায়গায় ঢাকায় ডিএসসিসি ১২টি মার্কেট স্থাপন করেছে। রেলওয়ের জমি উদ্ধারে বিগত সময়ে মন্ত্রীসহ দায়িত্বশীলরা প্রতিশ্রুতি দিলেও তা মূলত ঘোষণাতেই ছিল। লোক দেখানো উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে নতুন করে দখলের ব্যবস্থা করা হয়।
রেলওয়ের সম্পত্তি বিভাগের হিসাবে রাজধানীর ফুলবাড়িয়া পুরোনো রেলওয়ে স্টেশন এবং এর আশপাশের জমিগুলো রেলওয়ের হাতছাড়া হয়ে গেছে। রেলের জমিতে নির্মাণ হয়েছে বহুতল আবাসিক এবং বাণিজ্যিক ভবন।