নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একইসাথে আইএমএফ থেকে ৩ থেকে ৪ বছর মেয়াদে ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার কথাও ভাবছে বর্তমান সরকার। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, গত ২১ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল ও আইএমএফের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) নাইজেল ক্লার্কের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তাব তোলা হয়। একইসাথে নতুনভাবে ঋণ কর্মসূচি শুরু করার প্রস্তাব করে বাংলাদেশ।
এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফের বোর্ড সভায় বাংলাদেশের ঋণের শর্ত বাস্তবায়ন পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে সংস্থাটি চলমান ঋণ কর্মসূচির আওতায় কিস্তি ছাড় করতে অনীহা প্রকাশ করে নতুন শর্তে নতুন করে ঋণচুক্তি করতে সরকারকে পরামর্শ দেয়।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সরকার বর্তমান কর্মসূচিতে আর থাকতে চায় না। একইসঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচির সম্ভাব্য কাঠামো, সময়সীমা ও অর্থের পরিমাণ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আইএমএফও এ বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। আগামী মাসের শুরুতে এ বিষয়ে বাংলাদেশ আইএমএফকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যাংক ও রাজস্ব খাতের সংস্কারে অনীহা এবং ভর্তুকি কমানোর কৌশল বের করতে না পারার কারণেই বর্তমান সরকার আইএমএফের চলমান কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসছে।
নতুন ঋণ কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি মিশন ঢাকা সফর করবে। তখন ঋণের পরিমাণ, সময়সীমা ও শর্তাবলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
গত ১১ মে দৈনিক বণিক বার্তা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আইএমএফের চলমান ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব শর্ত রয়েছে, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য 'উপযুক্ত' নয়। জনগণের প্রতি 'দায়বদ্ধতা' থেকে সরকার আইএমএফের সব কথা মানতে পারবে না। অনেক জায়গায় আইএমএফের সঙ্গে দ্বিমত হচ্ছে। কারণ আইএমএফ যে শর্ত দিচ্ছে ওটা আমার অর্থনীতির জন্য, জনগণের জন্য স্যুটেবল না।
আইএমএফের শর্তের বিপক্ষে সরকারের অবস্থান জারি রাখার ব্যাখ্যায় আমির খসরু বলেন, 'আমরা নির্বাচিত সরকার। আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা আছে। তাদের কথামতো আমরা তো সব করতে পারব না।'
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগ সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর ৭ কিস্তিতে আইএমএফ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার চুক্তি করে। ইতোমধ্যে ওই ঋণের ৪টি কিস্তি ছাড় হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ঋণ ছাড় নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সর্বশেষ পঞ্চম কিস্তি ছাড় করার কথা ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে।
তখন আইএমএফের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচিত সরকার এলেই তারা ঋণ ছাড় করা সিদ্ধান্ত নেবে।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত হয় আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের স্প্রিং মিটিংয়ের ফাঁকে বাংলাদেশের সঙ্গে হওয়া এক বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, সংস্কার কার্যক্রমে সন্তোষজনক অগ্রগতি না হলে আর কোনো কিস্তির অর্থ ছাড় করা হবে না।
চলতি বছরের জুনের মধ্যে বিদ্যমান কর্মসূচির পঞ্চম ও ষষ্ঠ কিস্তি মিলিয়ে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে সংস্কার অগ্রগতিতে অসন্তোষ থাকায় সেই অর্থ ছাড় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
গত ১৯ এপ্রিল ওয়াশিংটন সফর শেষে দেশে ফিরে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছিলেন, 'আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া এই কর্মসূচিতে এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যা নতুন সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা নির্বাচিত সরকার। জনস্বার্থবিরোধী কোনো শর্ত আমরা মেনে নেব না।'
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, একটি সক্রিয় আইএমএফ কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার 'সিল অভ অ্যাপ্রুভাল' হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও অন্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, বড় আকারের বাজেট বাস্তবায়ন ও নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণে আগামী কয়েক বছরে বার্ষিক ৩-৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা প্রয়োজন হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফ থেকে বছরে অন্তত এক বিলিয়ন ডলার পাওয়া গেলে অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অর্থায়ন পাওয়া সহজ হবে।
বাংলাদেশ ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে এর আকার বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার পেয়েছে, বাকি রয়েছে ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার।
—জা.অর্থনীতি/এনজে
