কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান এবারও প্রস্তুত এশিয়ার ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তম ঈদ জামাত আয়োজনের জন্য। পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ১৯৯তম ঈদ জামাত ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে পুরো এলাকায়।
লাখো ধর্মপ্রাণ মুসল্লির সমাগমকে কেন্দ্র করে সম্পন্ন হয়েছে সার্বিক প্রস্তুতি। একই সঙ্গে নেওয়া হয়েছে চার স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে চালু রাখা হচ্ছে দুটি বিশেষ ট্রেন “শোলাকিয়া এক্সপ্রেস”।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন, কোরবানির বিষয়টি বিবেচনায় রেখে এবার ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে সকাল ৯টায়। জামাতে ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। ঐতিহ্যবাহী এই জামাতকে ঘিরে ইতোমধ্যে মাঠে দাগ কাটা, মেহরাব ও দেয়ালে চুনকাম, ওজুখানা নির্মাণ এবং পুরো ঈদগাহ ময়দানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
ঈদ জামাতে মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মাঠ ও আশপাশের এলাকায় চার স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। মাঠের ভেতরে বসানো হয়েছে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা এবং চারটি ওয়াচ টাওয়ার থেকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে মুসল্লিদের চলাচল ও সার্বিক পরিস্থিতি।
মঙ্গলবার (২৬ মে) দুপুরে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন, জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং র্যাব-১৪ সিপিসি-২ কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের স্কোয়াড্রন লিডার মো. আলী নোমান পৃথকভাবে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। পরে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলামও ঈদ জামাতের সার্বিক প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন।
জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, মাঠে জায়নামাজ ও মোবাইল ফোন ছাড়া অন্য কোনো বস্তু বহন করা যাবে না। নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য থাকবে ৭টি আর্চওয়ে গেট, মেটাল ডিটেক্টর ও চেকপোস্ট। পাশাপাশি ড্রোন ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা, পর্যাপ্ত সিসিটিভি, বোম ডিসপোজাল ইউনিট ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হবে।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন বলেন, মাঠের নিরাপত্তায় ৬০০ জন পুলিশ সদস্য, দুই প্লাটুন বিজিবি ও ৫৫ জন র্যা ব সদস্য নিয়োজিত থাকবে। এছাড়া ৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসানো হবে চেকপোস্ট।
দূরদূরান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের সুবিধার্থে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটি সকাল ৬টায় ভৈরব থেকে এবং অন্যটি সকাল সাড়ে ৫টায় ময়মনসিংহ থেকে ছেড়ে আসবে। মুসল্লিদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ মুসল্লিদের চিকিৎসা সেবায় মাঠে থাকবে মেডিকেল টিম ও স্বেচ্ছাসেবক দল।
র্যাব-১৪ সিপিসি-২, কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পের স্কোয়াড্রন লিডার মো. আলী নোমান বলেন, পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে র্যাব-১৪।
তিনি জানান, কন্ট্রোল রুম, ওয়াচ টাওয়ার ও অবজারভেশন পোস্টের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি পরিচালনা করা হবে। চেকপোস্ট ও মোবাইল টহলের মাধ্যমে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং তল্লাশি কার্যক্রম চলবে। ড্রোন, বাইনোকুলার ও সিসিটিভির মাধ্যমে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, মাঠের ওয়াচ টাওয়ারগুলোতে স্নাইপার টিম মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি স্ট্রাইকিং ফোর্স ও রিজার্ভ ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত থাকবে। শোলাকিয়া মাঠসংলগ্ন পশুর হাটে প্রতারণা ও জাল নোট প্রতিরোধে র্যাবের বিশেষ টিম দায়িত্ব পালন করবে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে ১৯৯তম ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ আয়োজন সফল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, র্যাব, বিজিবি, আনসারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, যেভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং মুসল্লিরা নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পেরেছিলেন, ঠিক তেমনি এবারের ঈদুল আজহার জামাতও সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরাপদভাবে সম্পন্ন হবে বলে আমি আশাবাদী।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন- অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত সরকার, শোলাকিয়া ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল হাসান মারুফ, কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের নামাজ চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে পুলিশের একটি নিরাপত্তা চৌকিতে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শোলাকিয়া ঈদ জামাতে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে এক লাখ ২৫ হাজার বা ‘সোয়ালাখ’ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকেই এ মাঠের নাম হয় ‘সোয়ালাখিয়া’, যা পরবর্তীতে ‘শোলাকিয়া’ নামে পরিচিতি পায়। প্রায় দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের ঐতিহ্যবাহী এই ঈদগাহে একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায় এমন বিশ্বাসে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লাখো মুসল্লি এখানে সমবেত হন।
ঐতিহ্য অনুযায়ী এবারও বন্দুকের গুলির মাধ্যমে ঈদ জামাত শুরুর সংকেত দেওয়া হবে। জামাত শুরুর ১৫ মিনিট আগে ৩টি, ১০ মিনিট আগে দুটি এবং ৫ মিনিট আগে একটি শটগানের গুলি ফোটানো হবে।
—জা.অর্থনীতি/এনজে