কারিমুল ইসলাম: শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মঞ্চে নামবেন লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোদের মতো মহাতারকারা। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে যেমন ভক্তদের মন পুড়বে সেরা তারকাদের বিদায়ের বিউগলে, তেমনি কিছু নতুন মুখের ঝলকানিতে মুগ্ধ হবে ফুটবল দুনিয়া। যারা হয়ে উঠবেন আগামী দিনের মহাতারকা।
ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোতে নিজেদের প্রতিভার ঝলক দেখানো একঝাঁক তরুণ ফুটবলার প্রস্তুত বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে নিজেদের আগমনী বার্তা দিতে। কেউ তো এরই মধ্যে জাতীয় দলের নির্ভরতার প্রতীক, কেউ আবার ‘ওয়ান্ডারকিড’ তকমা পেরিয়ে হয়ে উঠছেন ভবিষ্যতের সুপারস্টার। এদের মধ্যে সবার আগে উঠে আসবে লামিনে ইয়ামালের নাম। স্পেন এবং বার্সেলোনার হয়ে নিজের জাত চিনিয়ে এরই মধ্যে বিশ্ব ফুটবলের আলোচিত মুখ তিনি। ক্লাব এবং জাতীয় দল– দুই জায়গাতেই শিরোপার স্বাদ পেয়েছেন। এবার হয়তো স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতাতে মুখিয়ে আছেন আক্রমণ ভাগের এই ফুটবলার। ইয়ামালের মতো আর্দা গুলের, এনদ্রিক, ফেরমিন লোপেজ, জোয়াও নেভেসরাও স্মরণীয় করে রাখতে পারেন এবারের বিশ্বকাপ, নিজেদের ফুটবলীয় জাদুতে কেড়ে নিতে পারেন সব আলোচনা।
২৩তম বিশ্বকাপের আলো কেড়ে নিতে পারেন এমন ১০ তরুণ ফুটবলারকে নিয়েই এই আয়োজন।
লামিনে ইয়ামাল (স্পেন)
হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে আপাতত মাঠের বাইরে আছেন ইয়ামাল। তবে তাকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হচ্ছে না স্পেনের ভক্তদের। চোটের কারণে হয়তো বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে স্পেনের একাদশে নাও দেখা যেতে পারে বার্সেলোনার এই বিস্ময় বালককে। তবে স্পেনের বাকি ম্যাচগুলোতে তার খেলার সম্ভাবনা খুব বেশি। ইয়ামালকে দ্রুত মাঠে ফেরাতে চেষ্টার কমতি নেই মেডিকেল টিমের। চোট কাটিয়ে নিজের চেনা ছন্দে ফিরতে পারলে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতার খুব বেশি সুযোগ থাকবে তার। দুর্দান্ত একদল সতীর্থকে সঙ্গে নিয়ে স্পেন শিরোপা জিতলে ‘লা রোজা’র মূল চরিত্র হয়ে উঠতে পারেন তিনিই। ইয়ামালের জন্য এটি হতে পারে বহু বিশ্বকাপ জয়ের যাত্রার শুরু।
আর্দা গুলের (তুরস্ক)
তুরস্কের প্রতিভাবান প্রজন্মের অন্যতম বড় নাম আর্দা গুলার। দক্ষতা ও টেকনিকের বিচারে তিনি আরও ওপরে থাকার যোগ্য। তবে বিশ্বকাপ যাত্রায় রিয়াল মাদ্রিদের তারকার সামনে একটা শঙ্কাও থাকছে। তুরস্ক টুর্নামেন্টের শুরুতেই বাদ পড়লে সেরা তরুণ খেলোয়াড় হওয়ার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে তার। রিয়ালের হয়ে এই মৌসুমে একের পর এক অসাধারণ গোল করে দলে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করেছেন গুলার। ছোট গড়নের এই প্লে-মেকার যখন পুরো ছন্দে থাকেন, তখন তাকে থামানো কঠিন। ফেনারবাচেতে দেখা সম্ভাবনাটাই এখন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
এনদ্রিক (ব্রাজিল)
খেলার সময় ও ছন্দের ঘাটতির কারণে ব্রাজিল কোচ কার্লো সম্প্রতি দলে ডাক দেননি এনদ্রিককে। তবে ফ্রান্সের লিঁওতে ধারে খেলতে গিয়ে এখন দুর্দান্ত ফর্মে আছেন এই তরুণ। অর্ধ মৌসুমের ধারে খেলতে গিয়ে ১৫ ম্যাচ খেলা এই আন্তর্জাতিক ফুটবলার সমান সাতটি করে গোল ও অ্যাসিস্ট করেছেন। মাঝেমধ্যে কিছু নিষ্প্রভ পারফরম্যান্স থাকলেও লিঁওর হয়ে এনদ্রিক ছিলেন অসাধারণ।
আলেক্সান্দার পাভলোভিচ (জার্মানি)
টনি ক্রুসের অবসরের পর জার্মানি হারিয়েছে তাদের মাঝমাঠের অন্যতম সেরা অস্ত্রকে। সেই শূন্যতা পূরণের সবচেয়ে বড় দাবিদার এখন আলেক্সান্দার পাভলোভিচ। বায়ার্ন মিউনিখের আরেক প্রতিভা আলেক্সান্দার পাভলোভিচ ইতোমধ্যেই কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির শুরুর একাদশে নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন। বুন্দেসলিগা জয়ের পর এবার তার লক্ষ্য চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি। বায়ার্নের মূল দলে বেশি সুযোগ পাওয়ায় জার্মানির হয়েও বড় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা বেড়েছে পাভলোভিচের। কোচ জুলিয়ানাগেলসম্যান তার ওপর যথেষ্ট আস্থা রেখেছেন, যার প্রমাণ জাতীয় দলে ইতোমধ্যেই পাওয়া ৯ ম্যাচ। শান্ত মাথা, নিখুঁত পাসিং আর খেলার গতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাকে জার্মানির ভবিষ্যৎ ভরসায় পরিণত করেছে।
ফারমিন লোপেজ (স্পেন)
২০২৪ অলিম্পিকে স্পেনকে সোনা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর থেকেই আলোচনায় উঠে এসেছেন ফারমিন লোপেজ। তার ডায়নামিক প্লেমেকিং, তীব্রতা ও দূরপাল্লার শট নেওয়ার দক্ষতা স্পেনের মাঝমাঠে এনে দিয়েছে নতুন মাত্রা। শুরুর একাদশে নিয়মিত নাও হতে পারেন, তবে ফাবিয়ান রুইজ ও দানি ওলমোদের সঙ্গে জায়গার লড়াইয়ে থাকবেন তিনি। লোপেজের উপস্থিতি যে স্পষ্টভাবে অনুভূত হবে, তা বলাই যায়। বর্তমানে ইউরোপে মিডফিল্ডারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল ও অ্যাসিস্ট তার।
আন্তোনিও নুসা (নরওয়ে)
আর্লিং হাল্যান্ডের সঙ্গে মিলে নরওয়েকে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে তুলেছেন আন্তোনিও নুসা। আরবি লাইপজিগের এই ফরোয়ার্ডকে দলে ভেড়াতে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর আগ্রহ রয়েছে। তার জন্য বিশ্বকাপ হতে পারে নিজেকে আরও বড় মঞ্চে তুলে ধরার আদর্শ সুযোগ। লাইপজিগের এই তারকা নিজেকে ‘হাভক তৈরির কারিগর’ হিসেবে বর্ণনা করেন, অনেকটা ব্রাজিলিয়ান সুপারস্টার নেইমারের মতো। নরওয়েজিয়ান মা ও নাইজেরিয়ান বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া নুসার পদবি এসেছে নাইজেরিয়ার বেনিন কিংডম থেকে। যার অর্থ, ‘ঈশ্বর যা বলেন, তাই বাস্তবে ঘটে।’
ইবরাহিম এমবায়ে (সেনেগাল)
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে ইতিহাস গড়েন এমবায়ে। তিনি হন সেনেগালের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা এবং একবিংশ শতাব্দীতে আফকনে গোল করা সবচেয়ে কম বয়সি ফুটবলার। বর্তমানে লিগ ওয়ান চ্যাম্পিয়ন পিএসজির খেলোয়াড় এই তরুণ ইতোমধ্যেই বদলি হিসেবে নেমে করেছেন এক গোল ও দুই অ্যাসিস্ট। বিশ্বকাপেও সেনেগালের হয়ে আলো ছড়ানোর অপেক্ষায় তিনি। ইংলিশ ক্লাব অ্যাস্টন ভিলা তার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
জোয়াও নেভেস (পর্তুগাল)
২০২২ বিশ্বকাপের সময় জোয়াও নেভেস ছিলেন বেনফিকার যুব অ্যা কাডেমির উদীয়মান প্রতিভা। ওই বছরের ১১ ডিসেম্বর পর্তুগালের বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হওয়ার পর একটি প্রীতি ম্যাচে মূল দলের হয়ে অনানুষ্ঠানিক অভিষেক হয় তার। এখন ২১ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডার পিএসজির উদীয়মান তারকা। তারকায় ঠাসা পর্তুগাল দলে নেভেস যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন, তা নিয়ে খুব একটা সন্দেহ নেই।
নিকো পাজ (আর্জেন্টিনা)
কোমোর হয়ে খেললেও নিকো পাজ মূলত রিয়াল মাদ্রিদের ধারে থাকা ফুটবলার। ইতালিয়ান ক্লাবটির হয়ে এই মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে করেছেন ১২ গোল ও ছয় অ্যাসিস্ট। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপ বাছাই ও প্রীতি ম্যাচে এই তরুণকে সুযোগ দিয়েছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শিরোপা ধরে রাখার মিশনে আর্জেন্টিনার পরিকল্পনায় তিনি থাকবেন, সেটা প্রায় নিশ্চিত।
পাও কুবারসি (স্পেন)
বার্সেলোনার নবীন খেলোয়াড় থেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হয়ে উঠতে পাও কুবার্সির সময় লেগেছে মাত্র দুই বছর। মাত্র ১৮ বছর বয়সেই বলের নিয়ন্ত্রণ ও বোঝাপড়ায় তিনি অসাধারণ পরিণত। দেশের হয়ে অলিম্পিকে জিতেছেন স্বর্ণপদক। এবার উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপের মঞ্চে আরও একটি বড় অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন এই স্প্যানিশ ডিফেন্ডার।