মশিউর রহমান শাওন: ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য নাটকীয় মুহূর্ত আছে। আছে ম্যারাডোনার হ্যান্ড অব গড, জিদানের হেডবাট কিংবা পেলের জাদুকরী ফুটবল। বিশ্বকাপ দামামা বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠ ও মাঠের বাইরে তৈরি হয় অবিশ্বাস্য সব গল্প। ফুটবল বিশ্বকাপে এমনই এক গল্পের নায়ক একটি সাধারণ কুকুর।
আধুনিক ফুটবলের জন্মস্থান হিসেবে স্বীকৃত ইংল্যান্ড। ফলে প্রথমবার বিশ্বকাপ আয়োজনে দেশটির সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রাস্তা-ঘাটসহ সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বকাপ উন্মাদনা। আর সেই উন্মাদনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সোনালি জুলে রিমে ট্রফি।
ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৬৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে টেলিভিশন দর্শকদের কথা বিবেচনায় প্রথমবার রঙিন বল ব্যবহার করা হয়। কমলা কালারের ফুটবলে রঙিন হবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, এমন যখন অবস্থা ঠিক তখনই ট্রফি প্রদর্শনী অনুষ্ঠান থেকে চুরি হয়েছিল বিশ্বকাপ ট্রফি। এতেই বিশ্বকাপ শুরুর চার মাস আগে ইংল্যান্ড জুড়ে তৈরি হয় আতঙ্ক, লজ্জা আর বিশৃঙ্খলা। ইংল্যান্ডকে এই লজ্জার হাত থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা করেছিল ‘পিকলস’ নামের এক কালো-সাদা কুকুর।
লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টারের একটি প্রদর্শনীতে রাখা ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি। তবে ২০ মার্চ সকালে প্রদর্শনী কক্ষ খোলার পর দেখা যায় ট্রফি নেই। ভবনের অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র অক্ষত থাকায় তদন্ত সংস্থা নিশ্চিত হয়, চোরদের লক্ষ্যই ছিল শুধু বিশ্বকাপ ট্রফি।
ট্রফি চুরি হয়েছে খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো ইংল্যান্ডে তোলপাড় শুরু হয়। ট্রফি উদ্ধারে একযোগে মাঠে নামে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও লন্ডন পুলিশ। তদন্তে হাজারখানেক মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে কোনোভাবেই ট্রফি চোর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা।
ট্রফি চুরির কয়েক দিনের মধ্যে জ্যাকসন ছদ্মনামে পাওয়া চিঠিতে স্বস্তি পায় পুলিশ। চিঠিতে বলা হয় ট্রফি ফিরে পেতে দিতে হবে ১৫ হাজার পাউন্ড। পুলিশ রাজি হলেও বিশ্বাস রাখে নিজেদের কৌশলে। জ্যাকসনের সঙ্গে দেখা করতে নকল নোটভর্তি ব্যাগ নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয় গোয়েন্দা পুলিশের এক সদস্য। পাশাপাশি এলাকাজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয় প্রশাসনের সদস্যদের। ফলে শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হন জ্যাকসন।
ট্রফি চুরি অথবা চোর সম্পর্কে অবশ্য কিছুই জানতেন না জ্যাকসন। তার প্রকৃত নাম ছিল এডওয়ার্ড ব্যাচলি। তদন্তে এমন তথ্য পাওয়ার পর ব্যাচলিকে দুই বছরের জেল দেন স্থানীয় আদালত।
ট্রফি চুরির দিন কয়েক পার হলেও মিলছে না ট্রফির সন্ধান। এমন পরিস্থিতি ইংল্যান্ডের জন্য ক্রমেই বিব্রতকর হয়ে উঠছিল। ইংল্যান্ডজুড়ে যখন এই অবস্থা তখন নিয়মিত রুটিনে নিজ কুকুর পিকলসকে নিয়ে হাঁটতে বের হন দক্ষিণ লন্ডনের বাসিন্দা ডেভিড করবেট।
পিকলস ছিল সাধারণ মিশ্র জাতের কালো-সাদা কুকুর। দুষ্টুমি করলেও ঘ্রাণশক্তি ছিল দারুণ। ফোনকলের জন্য করবেট বুথে যাওয়ার পর রাস্তার পাশে গাড়ির নিচে রাখা সংবাদপত্রে মোড়ানো প্যাকেটের দিকে নজর যায় পিকলসের। সে প্যাকেটটি শুঁকতে শুরু করে।
নিজের কুকুর সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল করবেটের। সন্দেহ ও কৌতূহলী হয়ে প্যাকেট খুলতে শুরু করেন করবেট। প্যাকেট খোলার পর তিনি রীতিমতো চমকে যান। কেননা এই প্যাকেটের ভেতরে ছিল হারিয়ে যাওয়া জুলে রিমে ট্রফি।
ট্রফি উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ইংল্যান্ডজুড়ে পিকলস হয়ে ওঠে তারকা। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা পায় সে। টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার, রেডিও অনুষ্ঠানসহ সবখানেই আলোচনার প্রধান বিষয় ছিল পিকলস।
ট্রফি উদ্ধারের পর পিকলসকে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় এক হাজার পাউন্ড। প্রচলিত আছে এই ঘটনা অবলম্বনে ড্যানিয়েল পেট্রি তৈরি করেন ‘দ্য স্পাই উইথ আ কোল্ড নো’ নামক সিনেমা।
সে বছর পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয় ইংল্যান্ড। এরপর ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয় উদ্যাপনের অনুষ্ঠানেও বিশেষ অতিথি হিসেবে জায়গা পায় করবেটের কুকুর পিকলস।
উদ্ধার হওয়া এই ট্রফির ভাগ্য অবশ্য আরও নাটকীয়। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে দেশটিকে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ট্রফিটি আবারও চুরি হয়। ধারণা করা হয় ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছে, যার কারণে আর কখনও এই ট্রফির সন্ধান পাওয়া যায়নি।
বিশ্বকাপের বর্তমান ট্রফির ডিজাইন চূড়ান্ত হয় ১৯৭০ সালে। ইতালির ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার এই ট্রফি ডিজাইনের জনক। ট্রফির নিরাপত্তার কারণে মূল ট্রফির আদলে তৈরি রেপ্লিকা ব্যবহার করা সব জায়গায়। ফিফা সভাপতি ও বিশ্বকাপ জয়ী সদস্যরা ছাড়া খুব একটা কেউ আসল ট্রফি স্পর্শ করার সুযোগ পান না