জাহিদ হোসাইন খান: ফুটবল এখন আর শুধু মাঠের খেলা নয়; এটি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জীবনধারা, আবেগ এবং সংস্কৃতির অংশ। আর এই সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে ফ্যাশন। বর্তমান সময়ের ফুটবল তারকারা শুধু গোল করে দর্শকদের মন জয় করছেন না, নিজেদের পোশাক, হেয়ারস্টাইল, জুতা, অলংকার ও ব্যক্তিত্ব দিয়েও হয়ে উঠছেন বৈশ্বিক স্টাইল আইকন। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এখন তাদের ফ্যাশন সেন্সও সমানভাবে আলোচিত হয়।
বিশ্বের বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড এখন ফুটবল তারকাদের নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করছে। কারণ একজন জনপ্রিয় ফুটবলারের একটি ছবি বা ভিডিও মুহূর্তেই কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে ফুটবলাররা এখন শুধু ক্রীড়াবিদ নন, তারা একই সঙ্গে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির শক্তিশালী মুখ।
বর্তমান ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত স্টাইল আইকনদের একজন ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ী তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে। রিয়াল মাদ্রিদের এ তারকা ফুটবলার মাঠে তার গতি যেমন দুর্দান্ত, তেমনি মাঠের বাইরেও তার পোশাকের রুচি নজর কাড়ে সবার। সাধারণ কিন্তু অভিজাত স্টাইলের কারণে তরুণদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। স্যুট, জ্যাকেট কিংবা স্ট্রিটওয়্যার—সবকিছুতেই নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তোলেন এমবাপ্পে। ফ্যাশনে অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে তিনি স্মার্ট ও মিনিমাল লুক পছন্দ করেন, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে খুবই গ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে ব্রাজিলের নেইমার যেন ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সাহসী ফ্যাশন পরীক্ষক। কখনও গোলাপি চুল, কখনও সোনালি, আবার কখনও অদ্ভুত ডিজাইনের পোশাকে দেখা যায় তাকে। নেইমারের স্টাইল অনেকটাই রঙিন ও ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি প্রায়ই স্ট্রিট ফ্যাশন, বড় চেইন, ট্যাটু এবং ডিজাইনার স্নিকার্সে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তরুণদের কাছে তার এই আত্মবিশ্বাসী স্টাইল খুব জনপ্রিয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রতিটি নতুন লুক মুহূর্তেই আলোচনায় চলে আসে।
ফুটবল ও ফ্যাশনের সম্পর্কের আরেক বড় নাম ইংলিশ তারকা ফুটবলার জুড বেলিংহাম। বয়সে তরুণ হলেও স্টাইলের দিক থেকে তিনি ইতোমধ্যেই ফ্যাশন দুনিয়ায় আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন। ক্লাসিক স্যুট, আধুনিক কোট কিংবা ক্যাজুয়াল ফ্যাশন; সবকিছুতেই রয়েছে পরিমিত সৌন্দর্য। অনেক ফ্যাশন বিশ্লেষক মনে করেন, ভবিষ্যতে তিনি ফুটবলের পাশাপাশি ফ্যাশন জগতেও বড় প্রভাব ফেলবেন।
বর্তমান সময়ে ভিনিসিয়াস জুনিয়রের ফ্যাশন সেন্সও ব্যাপক আলোচিত। মাঠের বাইরে তাকে প্রায়ই দেখা যায় বিলাসবহুল স্ট্রিটওয়্যারে। বড় ব্র্যান্ডের জ্যাকেট, চশমা, স্নিকার্স এবং গয়নার ব্যবহারে তিনি তরুণদের কাছে নতুন এক ফ্যাশন ট্রেন্ড তৈরি করেছেন। তার পোশাকে ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির ছাপও স্পষ্টভাবে দেখা যায়।
ফ্যাশনের ক্ষেত্রে এখনও অন্যতম প্রভাবশালী নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। বয়স বাড়লেও স্টাইলের দিক থেকে তিনি এখনও সমান জনপ্রিয়। নিখুঁত ফিটিং স্যুট, ব্র্যান্ডেড ঘড়ি, দামি জুতা ও পরিপাটি হেয়ারস্টাইল— সব মিলিয়ে তিনি যেন আধুনিক পুরুষ ফ্যাশনের প্রতীক। নিজের ব্র্যান্ডের পোশাক ও পারফিউমও বাজারে এনেছেন তিনি। অনেক তরুণ এখনও তার স্টাইল অনুসরণ করেন।
একইভাবে লিওনেল মেসির ফ্যাশন সেন্সও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ছিলেন অনেকটাই সাধারণ। তবে বর্তমানে তাকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে অত্যন্ত স্টাইলিশ লুকে দেখা যায়। স্যুট, ব্লেজার ও ক্যাজুয়াল পোশাকে এখন তিনি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। তার ফ্যাশনে আড়ম্বর কম, তবে মার্জিত সৌন্দর্য বেশি।
বর্তমান ফুটবল দুনিয়ায় আফ্রিকান বংশোদ্ভূতের মধ্যেও ফ্যাশনের প্রভাব স্পষ্ট। ফরাসি তারকা পল পগবা দীর্ঘদিন ধরেই তার ব্যতিক্রমী হেয়ারস্টাইল ও রঙিন পোশাকের জন্য পরিচিত। যদিও তিনি এখন আগের মতো নিয়মিত মাঠে নেই, তবুও তার স্টাইল এখনও আলোচিত। পগবার চুলের ডিজাইন একসময় বিশ্বজুড়ে তরুণদের মধ্যে ট্রেন্ড হয়ে উঠেছিল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফুটবল ও ফ্যাশনের এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছে। ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা ইউটিউবে ফুটবলারদের দৈনন্দিন জীবন এখন সহজেই দেখা যায়। কে কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পরছেন, কোন জুতা ব্যবহার করছেন কিংবা কোন অনুষ্ঠানে কী স্টাইলে হাজির হচ্ছেন; সবই এখন ভক্তদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। অনেক তরুণ এখন ফুটবলারদের ফ্যাশন অনুসরণ করে নিজেদের ব্যক্তিত্ব প্রকাশের চেষ্টা করেন।
বাংলাদেশেও এই প্রভাব স্পষ্ট। দেশের তরুণদের মধ্যে ইউরোপিয়ান ক্লাবের জার্সি, স্নিকার্স, ওভারসাইজ টি-শার্ট কিংবা ফুটবলারদের হেয়ারস্টাইলের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বকাপ বা বড় টুর্নামেন্ট এলেই ফুটবল জার্সি যেন ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় ট্রেন্ডে পরিণত হয়। শুধু খেলা দেখা নয়, প্রিয় খেলোয়াড়ের স্টাইল অনুসরণ করাও এখন অনেকের কাছে এক ধরনের ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
ফুটবল তারকারা এখন কেবল মাঠের নায়ক নন, তারা সংস্কৃতি ও স্টাইলেরও প্রতিনিধি। তাদের পোশাক, জীবনধারা ও আত্মপ্রকাশ তরুণ সমাজকে প্রভাবিত করছে প্রতিনিয়ত। তাই আধুনিক বিশ্বে ফুটবল ও ফ্যাশন একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। মাঠের গোল যেমন দর্শকদের আনন্দ দেয়, তেমনি মাঠের বাইরের স্টাইলও তৈরি করছে নতুন প্রজন্মের ফ্যাশন ভাষা।