যিনি বদলে দেন ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাস
ফাইল ছবি

ফুটবলে অধিনায়কের গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক বহুদিনের। ক্রিকেটে যেখানে অধিনায়ককে দলের মস্তিষ্ক বলা হয়, ফুটবলে সেখানে কোচই মূল পরিকল্পনাকারী! ফরমেশন, কৌশল, একাদশ নির্বাচন কিংবা বদলি-সবকিছুই নির্ধারণ করেন কোচ। অধিনায়কের কাজ যেন অনেকটাই প্রতীকী; টস করা, সতীর্থদের উৎসাহ দেওয়া কিংবা মাঠে নেতৃত্বের উপস্থিতি দেখানো। তাই অনেক সমালোচকের মতে, ফুটবলে অধিনায়কের বাড়তি গুরুত্ব নেই।

কিন্তু এই তর্ক থেমে যায় যখন আলোচনায় আসে বিশ্বকাপ জয়ী অধিনায়কদের নাম। ফুটবল ইতিহাসে যারা বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছেন, তারা শুধু একজন খেলোয়াড় নন-একটি জাতির গর্ব, একটি প্রজন্মের স্মৃতি। ইংল্যান্ডের জন্য সেই নামটি ববি মুর। যে মানুষটি ইংল্যান্ডকে এনে দিয়েছেন তাদের একমাত্র বিশ্বকাপ শিরোপা।

ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে অসংখ্য কিংবদন্তি জন্ম নিয়েছেন। স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউস, ব্রায়ান রবসন, কেভিন কিগ্যান, পিটার শিলটন, গ্যারি লিনেকার কিংবা ডেভিড বেকহ্যামের মতো তারকারা বিশ্বজুড়ে আলো ছড়িয়েছেন। কিন্তু বিশ্বকাপ নামের সোনার হরিণ ছুঁতে পারেননি তারা কেউই। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন ববি মুর। তাই ইংল্যান্ডে তার নাম উচ্চারিত হয় অন্য রকম শ্রদ্ধায়।

রবার্ট ফ্রেডেরিক চেলসি মুর, যাকে ফুটবল বিশ্ব চিনেছে ববি মুর নামে, জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালের ১২ এপ্রিল ইংল্যান্ডের বার্কিং, এসেক্সে। ডিফেন্ডার হিসেবে খেলা এই ফুটবলারকে ফুটবল বোদ্ধারা মনে করেন সর্বকালের অন্যতম সেরা রক্ষণভাগের খেলোয়াড়। তার খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ম্যাচ রিডিং, অ্যান্টিসিপেশন, অসাধারণ হেডওয়ার্ক এবং দুর্দান্ত গতি। মাঠে তার ফুটবল ছিল সাজানো-গোছানো, পরিপাটি আর বুদ্ধিদীপ্ত।

ফুটবল মহাতারকা পেলেও ববি মুরের প্রশংসায় ছিলেন উদার। পেলের চোখে ববি মুর ছিলেন রক্ষণভাগের ‘অতন্দ্র প্রহরী’। এমন স্বীকৃতি যে কোনো ডিফেন্ডারের জন্যই বিরল সম্মান।

ববি মুরের ক্যারিয়ারের বড় অংশ কেটেছে ওয়েস্ট হ্যাম ইউনাইটেডে। ১৯৫৬ সালে ক্লাবটিতে যোগ দেন তিনি। দুই বছর যুবদলে কাটানোর পর ১৯৫৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হয় তার। এর পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন দলের নিয়মিত মুখ।

তবে মজার বিষয় হলো, ইংল্যান্ডের লাল জার্সি গায়ে চাপানোর আগে ক্রিকেটও খেলেছিলেন ববি মুর। এসেক্সের যুবদলের হয়ে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছেন তিনি। সেই দলে তার সতীর্থ ছিলেন আরেক কিংবদন্তি ফুটবলার জিওফ হার্স্ট।

১৯৬০ সালে ইংল্যান্ড অনূর্ধ্ব-২৩ দলে জায়গা পান মুর। মাত্র দুই বছরের মধ্যেই সুযোগ পান জাতীয় দলে। ১৯৬২ বিশ্বকাপের আগে পেরুর বিপক্ষে একটি প্রদর্শনী ম্যাচ দিয়ে শুরু হয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। পুরো টুর্নামেন্টে ভালো খেললেও ইংল্যান্ড থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে। দুর্দান্ত ব্রাজিলের কাছে হারতে হয় তাদের।

১৯৬৩ সালের ২৯ মে ববি মুরের জীবনের অন্যতম স্মরণীয় দিন। জনি হেইন্সের অবসরের পর ইংল্যান্ডের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, মাত্র ১২তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেই ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হন তিনি। সবচেয়ে কম বয়সে ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হওয়ার রেকর্ডও গড়েন সেবার।

এর পর আসে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ। নিজেদের মাটিতে অনুষ্ঠিত সেই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের পথ মোটেও সহজ ছিল না। গ্রুপ পর্ব পেরোতে ঘাম ঝরাতে হয়েছে তাদের। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের জয় ছিল বিতর্কিত। পর্তুগালের বিপক্ষে সেমিফাইনাল জয় নিয়েও আলোচনা ছিল তুঙ্গে।

তার পর আসে বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল-প্রতিপক্ষ পশ্চিম জার্মানি। কিন্তু সেই ম্যাচের আগে বড় এক শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ববি মুরকে ফাইনাল থেকে বাদ দেওয়ার চিন্তাও করা হয়েছিল। কারণ মনে করা হচ্ছিল, তিনি কিছুটা ধীর হয়ে গেছেন এবং জার্মানদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবেন না। শেষ পর্যন্ত তাকে রেখেই মাঠে নামে ইংল্যান্ড। আর সেই সিদ্ধান্তই ইতিহাস বদলে দেয়।

ফাইনালে প্রথমে পিছিয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। কিন্তু মুরের বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকেই আসে সমতাসূচক গোলের সূচনা। জার্মান হাফলাইনের কাছে ফাউলের শিকার হওয়ার পর দ্রুত ফ্রি-কিক নিয়ে বল পাঠান জিওফ হার্স্টের দিকে। হার্স্টের হেডে গোল করে সমতায় ফেরে ইংল্যান্ড। পরে রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। অতিরিক্ত সময়ে আরও দুই গোল করে ৪-২ ব্যবধানে জয় পায় ইংল্যান্ড।

এরপর রানী এলিজাবেথের হাত থেকে জুলে রিমে ট্রফি গ্রহণ করেন ববি মুর। সেটিই ছিল ইংল্যান্ডের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বকাপ জয়। সেই মুহূর্ত আজও ইংলিশ ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় স্মৃতিগুলোর একটি।

জাতীয় দলের হয়ে ১৯৬২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত খেলেছেন ববি মুর। ১৯৭৩ সালে ১০৮ আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে জাতীয় দলকে বিদায় জানান, যা সে সময় ইংল্যান্ডের রেকর্ড ছিল। পরে গোলরক্ষক পিটার শিলটন সেই রেকর্ড ভাঙেন।

তবে ববি মুরের জীবনে বিতর্কও ছিল। ১৯৭০ বিশ্বকাপের আগে ইংল্যান্ড দল কলম্বিয়ার বোগোটায় ট্রেনিং ক্যাম্প করছিল। সেখানে এক দোকান থেকে সোনার ব্রেসলেট কেনাকে কেন্দ্র করে চুরির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল, দোকানির চোখ ফাঁকি দিয়ে ব্রেসলেট নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। ববি চার্লটনের স্ত্রী নোরমার জন্য উপহার কিনতেই দোকানে গিয়েছিলেন মুর। ঘটনাটি এতটাই আলোড়ন তোলে যে তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়। যদিও পরে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।

মাঠে তিনি ছিলেন নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা আর আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। কিন্তু জীবনের শেষ লড়াইয়ে জিততে পারেননি। লিভার ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি মারা যান ইংল্যান্ডের এই কিংবদন্তি অধিনায়ক।

আজও ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে যখনই বিশ্বকাপের কথা ওঠে, প্রথমেই ফিরে আসে একটি নাম-ববি মুর। কারণ ফুটবলের জন্মভূমিকে বিশ্বসেরা করার গল্পটা যে তার হাত ধরেই লেখা হয়েছিল!

একনজরে
পুরো নাম : রবার্ট ফ্রেডেরিক চেলসি মুর 
জন্ম: ১২ এপ্রিল ১৯৪১ 
মৃত্যু : ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩
পজিশন: ডিফেন্ডার 
ক্যারিয়ার শুরু: ১৯৫৮ (ওয়েস্ট হামের হয়ে) 
ইংল্যান্ড জাতীয় দলের হয়ে অংশগ্রহণ : ১৯৬২ থেকে ১৯৭৩
জন্মস্থান : বার্কিং এসেক্স, ইংল্যান্ড