দূর প্রবাসে থাকা প্রেমিকের সাথে হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও কলে আংটি বদল, কিংবা মেসেঞ্জারে ‘কবুল’ লিখে বিয়ের পর্ব সেরে ফেলা—ডিজিটাল যুগে এমন দৃশ্য এখন আর সিনেমা-নাটকে সীমাবদ্ধ নেই। বাস্তব জীবনেও অনেকেই আইনি জটিলতা এড়াতে বা আবেগের বশে কাজী অফিসে গিয়ে শুধু কাবিননামায় সই করে ভাবেন বিয়ে তো হয়েই গেল! কিন্তু প্রশ্ন হলো, মুখে ‘কবুল’ না বলে কিংবা অনলাইনের চ্যাটিং বক্সে সম্মতি জানালেই কি ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী সেই বিয়ে বৈধতা পায়?
সোশ্যাল মিডিয়ার এই রমরমা যুগে আমাদের জীবনের অনেক কিছুই ভার্চুয়াল হয়ে গেছে। কিন্তু ইসলামি ফিকাহ শাস্ত্র বলছে, বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও সংবেদনশীল বন্ধন কেবল কাগজে সই বা ডিজিটাল বার্তার মাধ্যমে সম্পন্ন হতে পারে না। শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ের মূল ভিত্তি হলো ‘আকদ’ বা চুক্তি, যার জন্য কিছু অবিকল্প শর্ত রয়েছে।
ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো পাত্র-পাত্রী কিংবা তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধির (ওয়াকিল) একই মজলিসে বা বৈঠকে উপস্থিত থাকা। ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপে এক পক্ষ প্রস্তাব (ইজাব) দিল আর অন্য পক্ষ টাইপ করে ‘কবুল’ লিখল, এতে বিয়ের ধর্মীয় শর্ত পূরণ হয় না। কারণ, এখানে সরাসরি শারীরিক উপস্থিতির অভাব থাকে।
বিয়ের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো ‘সাক্ষী’। সাক্ষী ছাড়া যেকোনো গোপন বা ডিজিটাল বিয়ে ইসলামে বাতিল বলে গণ্য। সহিহ ইবনে হিব্বানের একটি বিখ্যাত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট ইরশাদ করেছেন, অভিভাবক এবং দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীর উপস্থিতি ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হয় না।
শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, বিয়ের মজলিসে অন্তত দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারীর সরাসরি উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। পাত্র-পাত্রী নিজেরা দেখা করলেও যদি সেখানে উপযুক্ত সাক্ষী না থাকে এবং তারা যদি মুখে ইজাব-কবুল না শোনেন, তবে সেই বিয়ে বৈধ হবে না। কেবল কাবিননামায় সই করা একটি আইনি প্রক্রিয়া মাত্র, এটি মুখের ‘কবুল’ বা মৌখিক সম্মতির বিকল্প নয়।
তবে আধুনিক ফিকাহবিদদের মতে, পাত্র বা পাত্রী বিদেশে থাকলে ভিডিও কলের মাধ্যমে বিয়ে হতে পারে, যদি উভয় প্রান্তে নির্ভরযোগ্য অভিভাবক ও প্রয়োজনীয় সাক্ষী উপস্থিত থাকেন এবং তারা উকিল নিযুক্ত করে ইজাব-কবুল গ্রহণ করেন।
সুতরাং, লাইক-কমেন্টের যুগে অবাস্তব রোমাঞ্চে ভেসে শুধু কাগজে সই বা মেসেজের ‘কবুল’ দিয়ে দাম্পত্য জীবন শুরু করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। জীবনের এই বড় সিদ্ধান্তটি নেওয়ার আগে শরিয়তের নিয়ম ও সাক্ষীদের উপস্থিতিতে মুখে ‘কবুল’ বলার বিধানটি মেনে চলাই একজন মুসলিমের দায়িত্ব।
জা. অর্থনীতি/ উমার
