লাখো মানুুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

গোলাম রব্বানী, নীলফামারী: ব্রিজ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি আর বুক ভরা আশা নিয়ে একটি বাঁশের সাঁকো দিয়েই ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলছে ১৫ গ্রামের প্রায় লাখ মানুষের যাতায়াত।

নীলফামারীর সদর লক্ষীচাপ ইউনিয়নের দেওনাই নদীর ওপর বসুনিয়ারডাঙ্গা গ্রামের বাঁশের সাঁকোটি অবস্থিত।

হাজারো প্রতিশ্রুতির পরেও দেওনাই নদীর ওপর পাকা সেতু নির্মাণ হয়নি। নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই এখন ভরসা। পাকা সেতু নির্মাণ না হওয়ায় ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছে এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে। এখন পাকা সেতু নির্মাণের দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাঁশের সাঁকোটি দিয়ে নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ, কাচারী, শিশাতলী, জংলীপাড়া, দুবাছুরি, বল্লমপাঠ, কচুয়া ও দাঁড়িহারা জলঢাকা উপজেলার ডিয়াবাড়ী ও শিমুলবাড়ী গ্রামের মানুষজন প্রতিদিন নীলফামারী জেলা শহর, ডোমার উপজেলা শহর ও জলঢাকা উপজেলায় যাতায়াত করে থাকেন।

এছাড়া এই ৩ উপজেলা শহরে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের একমাত্র ভরসা এই বাঁশের সাঁকো। নদীর ওপর নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দুই ঘাটের সংযোগ রক্ষা করে। ওই বাঁশের অস্থায়ী সাঁকো দিয়ে নদীর দুই পাড়ের বাসিন্দারা যাতায়াত করে থাকেন। পাকা সেতু না থাকায় ভীষণ সমস্যায় পড়েন।

লোকজন ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে সাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে হেঁটে সাঁকো পার হচ্ছেন। অনেকে আবার পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরাও পায়ে হেঁটে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন। সাবধানে চলাচল করছেন সবাই। কারণ সাঁকোর ওপর থেকে অনেকে পড়ে আহত হয়েছেন। একটু অন্যমনস্ক হলে যেকোনো সময় পড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

বসুনিয়াডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা আকাশ চৌধুরী বলেন, বাঁশের সাঁকোতে চলাচলের খুব সমস্যা পড়তে হয়। এমনকি কয়েকদিন আগে সাঁকোটি ভেঙ্গে পানিতে পড়েছিল। খরা মৌসুমে বাঁশের সাঁকো দিয়ে কোনও রকম নদী পারাপার হলেও বর্ষাকালে নদী জলে ভরে থাকায় প্রচন্ড সৌতে বাঁশের সাঁকো দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এই স্থানে একটি সেতুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কোনো সুফল হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা ললিত চন্দ্র রায় একরাশ ক্ষোভ নিয়ে বলেন, গত বছর আমার ছেলে বাঁশের সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে আহত হয়। আমরা অনেক কষ্ট করে যাতায়াত করি। কৃষকদের যতো মালামাল এই ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার করতে হয়। স্বাধীনতার পর ভারত থেকে ফিরে আসার পর শুনি ব্রিজটি হবে, কিন্তু আজও হয় না।

বসুনিয়ারডাঙ্গা গ্রামের মিলন বলেন, আমাগো দুঃখ-কষ্টের কথা কেউ শোনে না। বর্ষার সময় সাঁকোটি পার হওয়া অনেক কষ্টের। নদীভরা পানি থাকে। তখন সাঁকোটি নড়বড়ে হয়ে যায়। আমগরে কষ্ট কেউ বুঝে না। বহু বছর ধরে শুনি, এখানে সেতু হবে। কিন্তু কখনো আর সেতু হলো না। আর হবে কি না, সেটাও জানি না। ব্রিজটি হলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হয়।

বসুনিয়ারডাঙ্গা গ্রামের বাবুল হোসেন বলেন, স্বাধীনতার পর ভারত থেকে ফিরে আসার পর শুনি ব্রিজটি হবে, কিন্তু আজও হয় না। প্রতিবার ভোটের সময় ওই ঘাটে পাকা সেতু নির্মাণের বিষয়টি ওঠে। ভোট ফুরালে আর কারও দেখা মেলে না। পাকা সেতু নির্মাণের ব্যাপারে এলাকার সংসদ সদস্য, বিধায়কদের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনকে বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু কারও কোনো হেলদোল নেই।

মোটরসাইকেল আরোহী প্রদীপ বলেন, আমি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি। আমার বাসা নদীর ঐ পাড়ে তাই আমাকে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। অনেক সময় মোটরসাইকেল নিয়ে পার হওয়া যায় না। ছেলে-মেয়েরা বর্ষা মৌসুমে স্কুলে যেতে পারে না। সেতুর অভাবে রোগীদের পড়তে হয় সবচেয়ে দুর্ভোগে।

লক্ষীচাপ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমিনুর রহমান বলেন, প্রতিদিন এই সাঁকোর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে হাজার হাজার লোক যাতায়াত করে থাকেন। ব্রিজটি হলে যাতায়াতের সুবিধার পাশাপাশি এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়বে। ব্রিজ নির্মাণের বিষয়ে আমি এলজিইডি অফিসে অনেকবার যোগাযোগ করেছি।

নীলফামারী স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী ফিরোজ কবির হোসেন বলেন, একটি প্রকল্প তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। ওই স্থানে একটি সেতু করার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। আশা করি, খুব দ্রুত হয়ে যাবে।

এ বিষয়ে নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আল ফারুক আব্দুল লতিফ বলেন, আমার নীলফামারী সদর আসনের সবগুলো ব্রিজ তালিকা করে পাঠানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে। 

—জা.অর্থনীতি/এনজে