ভারতে হঠাৎ বেড়েছে স্বর্ণ বন্ধক রাখার ধুম, কারণ কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে স্বর্ণঋণের বাজারে রেকর্ড প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। স্বর্ণের দামের লাগাতার ঊর্ধ্বগতির কারণে একই পরিমাণ স্বর্ণ বন্ধক রেখে আগের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ নিতে পারছেন গ্রাহকরা। এর ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্বর্ণঋণের গড় টিকিট সাইজ বা গড় ঋণের পরিমাণ বছরে ৩৯ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার রুপি।

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এক্সপেরিয়ান-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে গড় স্বর্ণঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে গড় ঋণ ছিল ৯৮ হাজার রুপি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ১ লাখ ৯৬ হাজার রুপিতে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দুই বছরে স্বর্ণের মূল্যসূচক ১৪৪ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে স্বর্ণঋণ অনুমোদনের অর্থমূল্য বেড়েছে প্রায় ২০০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের বাজারমূল্য যত বাড়ছে, একই পরিমাণ স্বর্ণ বন্ধক রেখে তত বেশি ঋণ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতাও বেড়েছে।

ভারতের মোট স্বর্ণঋণ পোর্টফোলিও ২০২৩ সালের মার্চে ছিল ৬.৩ লাখ কোটি রুপি। মাত্র তিন বছরের মধ্যে তা বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে ১৯.৪ লাখ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ৩ লাখ রুপির বেশি অঙ্কের স্বর্ণঋণের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

মোট খুচরা ঋণের মধ্যে স্বর্ণঋণের অংশও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই হার ছিল ২০ শতাংশ। পরের বছর তা বেড়ে ৩০ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে স্বর্ণঋণ অনুমোদনের অর্থমূল্য আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৫ শতাংশ এবং ঋণের সংখ্যা ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এক্সপেরিয়ান ইন্ডিয়ার কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর মনীশ জৈন বলেন, ভারতের মতো দেশে পরিবারের হাতে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে। সেই স্বর্ণকে সহজে নগদ অর্থে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করছে স্বর্ণঋণ। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ছে এবং ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনের সময় দ্রুত অর্থের জোগান পাচ্ছেন।

একসময় দক্ষিণ ভারতেই স্বর্ণঋণের বাজার সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত ছিল। তবে এখন দেশের অন্যান্য রাজ্যেও এর বিস্তার দ্রুত ঘটছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নতুন স্বর্ণঋণ বিতরণে উত্তর প্রদেশে ১৩৮ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে ১১২ শতাংশ, রাজস্থানে ১০৫ শতাংশ এবং মহারাষ্ট্রে ১০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, স্বর্ণভিত্তিক ঋণ এখন সারা ভারতেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট গ্রাহকের প্রায় ৭০ শতাংশের একটি করে স্বর্ণঋণ রয়েছে। তবে পুনরায় ঋণ নেওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্রাহকই ছিলেন পুনরায় ঋণগ্রহণকারী। অর্থাৎ, স্বর্ণঋণ এখন এককালীন নয়; বরং নিয়মিত আর্থিক চাহিদা পূরণের নির্ভরযোগ্য উৎসে পরিণত হয়েছে।

স্বর্ণঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়লেও খেলাপি ঋণের হার কমেছে। ৯০ দিনের বেশি সময় বকেয়া থাকা ঋণের হার ২০২৩ সালের মার্চে ছিল ০.৪ শতাংশ, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে ০.২ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি প্রমাণ করে যে স্বর্ণঋণ খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঋণের মানও স্থিতিশীল রয়েছে এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।

জা.অর্থনীতি/এসআই