কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: কিশোরগঞ্জের হাওরে প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার এক বাস্তব উদাহরণ গত ২৬ জুনের হৃদয়বিদারক ঘটনাটি।
অষ্টগ্রাম উপজেলার পূর্ব অষ্টগ্রাম ইউনিয়নের হাবলীপাড়া গ্রামের আয়তুল ইসলাম ইদু (২৪) পেশায় স্থানীয় মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ী।
গত ২৬ জুন ভোর ৪টার দিকে প্রসববেদনা শুরু হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের (২০)। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে স্থানীয় দাই ও গ্রাম্য চিকিৎসকের মাধ্যমে প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রসূতির অবস্থা জটিল হয়ে উঠতে থাকে। সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টা। স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন স্বামী আয়তুল ইসলাম ইদু। সিদ্ধান্ত নেন বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরের জহুরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাবেন। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল আরও বড় এক দুর্ভোগ। অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বাড়ির কাছেই থাকলেও সেখানে যাননি ইদু।
কারণ জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাইনি। ভয় ছিল সেখানে নিয়ে গেলে আবার রেফার করে দেবে। তাহলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। সরকারি হাসপাতালের ওপর ভরসা করার সাহস ছিল না। বর্ষাকালে হাওরের যোগাযোগ ব্যবস্থা তো সেই এক রকমেরই। নেই দ্রতগতির স্পিডবোট বা সরকারি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। অবশেষে দেওঘর ঘাট থেকে একটি সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রলারে প্রসূতিকে নিয়ে রওনা হন স্বজনরা। কিন্তু ভাগ্য যেন তখনও তাদের সঙ্গে ছিল না। হুমায়পুর থেকে পাটুলীঘাটের পথে মাঝ হাওরে পৌঁছতেই তীব্র প্রসববেদনা শুরু হয় স্বপ্নার। সেই ট্রলারে নিজের অসুস্থ মাকে নিয়ে যাচ্ছিলেন হুমায়পুর ইউনিয়ন পরিষদের কম্পিউটার অপারেটর হারিস মিয়া। তিনি পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।
তিনি বলেন, “নৌকায় কোনো পর্দা ছিল না। একজন মা যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। আমি মাঝির কাছ থেকে বৃষ্টিতে ব্যবহৃত একটি নোংরা পলিথিন নিয়ে কোনো রকমে আড়াল তৈরি করি। সেই পলিথিনের আড়ালে ট্রলারের কাঠের মেঝেতেই জন্ম নেয় একটি ফুটফুটে কন্যাশিশু।”
তিনি আরও বলেন, জন্মের পর প্রথম কয়েক মিনিট শিশুটি স্বাভাবিক ছিল। পরে হঠাৎ করেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। ট্রিলারে কোনো অক্সিজেন ছিল না। আমি নিজেই বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েছিলাম। ছটফট করতে করতে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই সে নিস্তব্ধ হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল, একটু অক্সিজেন পেলেই হয়তো শিশুটি বেঁচে যেত। শিশুটির মৃত্যুর পরও শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের অসুস্থ মাকে ঘাটে রেখে নবজাতক ও প্রসূতিকে নিয়ে বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছুটে যান হারিস মিয়া। কিন্তু সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
ঘটনাটিকে হাওরাঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার প্রতীক বলে মন্তব্য করেছেন অষ্টগ্রাম উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক তিতুমীর হোসেন সোহেল।
তিনি বলেন, নৌকায় প্রসব এবং জন্মের কিছুক্ষণ পরই শিশুর মৃত্যু- এই ঘটনাই বলে দেয় হাওরের স্বাস্থ্যসেবার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওরবাসীর চিকিৎসাসেবাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
তিনি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বলেন, অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার থাকলেও গাইনি ও অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ নেই। জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য কোনো নৌ-অ্যাম্বুলেন্স নেই। এমনকি হাসপাতালের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটিরও এক বছর ধরে সরকারি চালক নেই।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রসববেদনায় কাতর এক গর্ভবতী নারী। রাতের অন্ধকারে ছোট্ট একটি নৌকায় করে তাকে নেওয়া হচ্ছে জেলা শহরের হাসপাতালে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অপারেশন থিয়েটার আছে, যন্ত্রপাতিও আছে; নেই শুধু অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ ও সার্জন। দীর্ঘ জলপথ পাড়ি দিতে দিতেই নিভে যায় মায়ের জীবন। পৃথিবীর আলো দেখা হয় না অনাগত শিশুরও। কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা এক নির্মম বাস্তবতা।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, হাওর অধ্যুষিত উপজেলাগুলোতে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, সার্জন ও অবেদনবিদের অভাবে অধিকাংশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশন কার্যত বন্ধ। ফলে জটিল প্রসূতি রোগীদের জেলা সদর বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে হয়। কিন্তু দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, দীর্ঘ নৌপথ ও সময়ক্ষেপণের কারণে অনেক মা ও নবজাতক গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, প্রতি সপ্তাহেই হাওরাঞ্চল থেকে শহরে আনার পথে নৌকা কিংবা ট্রলারে অন্তত একজন প্রসূতি বা নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। কয়েক দশক ধরে চলা এই সংকটের কার্যকর সমাধান আজও হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইটনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৩৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৩ জন। অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন অনুপস্থিত।
স্থানীয়দের দাবি, গত দেড় বছরে যোগাযোগ সংকট ও সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ায় ৭ থেকে ৮ জন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। তাদের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছে গর্ভের অনাগত শিশুও। অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের ৩৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৪ জন। এখানে কোনো ধরনের অপারেশন হয় না। প্রতিদিন গড়ে ১০ জন প্রসূতি, নারী ও শিশু রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। অর্থাভাবে অনেকেই চিকিৎসা না নিয়েই বাড়ি ফিরে যান। মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারিয়ান অপারেশন চালু থাকলেও চিকিৎসকের ৩১টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১৩ জন। সেবার মান নিয়ে অভিযোগ থাকায় অনেক প্রসূতি জেলা শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
অষ্টগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহ মো. মহিবুল্লাহ বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে জরুরি প্রসূতি রোগীদের সিজারিয়ান অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। আবাসন সংকটও চিকিৎসক ধরে রাখার অন্যতম বাধা।
জেলার প্রবীণ চিকিৎসক ডা. মো. আতিকুল সারোয়ার বলেন, দীর্ঘ ৪ দশকের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখেছেন, হাওরে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার অভাবে প্রতিবছর অসংখ্য প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্জন, অ্যানেসথেশিয়া বিশেষজ্ঞ এবং ২৪ ঘণ্টা সিজারিয়ান সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক কমিটির সভাপতি মো. ফিরোজ উদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, হাওরে কার্যত প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা অনুপস্থিত। স্বাস্থ্য বিভাগের কঠোর তদারকি ও কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া মাতৃমৃত্যু কমানো যাবে না।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নাজমুল করিম বলেন, হাওরে প্রসূতি চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নতুন চিকিৎসক যোগ দেওয়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। সার্জন, অ্যানেসথেশিয়া ও শিশু বিশেষজ্ঞের শূন্য পদ পূরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
—জা.অর্থনীতি/এনজে