একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে পায়ে হেঁটে ১০, বড়জোর ৫০ বা ১০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু একজন মানুষ যদি শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি আর পবিত্র হজ পালনের স্বপ্ন বুকে নিয়ে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিতে বেরিয়ে পড়েন—তাহলে তা শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এটাই আজকের বাস্তবতা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা প্রচার করতে, যেন তারা পায়ে হেঁটে এবং সব ধরনের কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে হজে আসে।’ ঠিক এই আহ্বানকেই হৃদয়ে ধারণ করে নাটোরের এক সাধারণ মানুষ শুরু করেছেন তার জীবনের সবচেয়ে অসাধারণ যাত্রা।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের তারাই বড়ইচোড়া গ্রামের বাসিন্দা দুলাল হোসেন মঙ্গলবার সকাল ১০টায় নিজ বাড়ি থেকে পবিত্র মক্কার উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে রওনা দিয়েছেন। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল কাবা শরিফে পৌঁছে হজ পালন করা, আর সেই স্বপ্নপূরণের যাত্রায় সঙ্গী হয়েছে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসীর দোয়া।
বিদায়ের মুহূর্তে গ্রামে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। শত শত মানুষ তাকে বিদায় জানাতে ভিড় করেন এবং নিরাপদ যাত্রার জন্য দোয়া করেন।
বিদায়ের সময় দুলাল হোসেন বলেন, দেশে-বিদেশে যে যেখানেই থাকুন, সবার কাছে তিনি দোয়া চান। ভিসার জন্য সরকারের কাছেও তিনি আবেদন জানান, যেন সবার সহযোগিতা ও দোয়ায় তিনি সৌদি আরব পৌঁছে হজ পালন করে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে আসতে পারেন।
দীর্ঘ এই পথে তিনি সঙ্গে যা নিয়েছেন তা খুবই সামান্য:
একটি জায়নামাজ, কাফনের কাপড়, পথে গোসলের জন্য কাপড়-চোপড়, পাসপোর্ট, ভোটার আইডি কার্ড ও চেয়ারম্যানের পরিচয়পত্র, আতর-গোলাপজল, শরীরব্যথা ও প্রয়োজনীয় স্যালাইনের মতো সামান্য কিছু ওষুধ
দুলাল হোসেনের ভাষায়, আল্লাহর ঘরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পথ দীর্ঘ, কষ্ট অনেক, কিন্তু আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখেই তিনি যাত্রা শুরু করেছেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই হাদিস, যেখানে ধারাবাহিকভাবে হজ ও ওমরা পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ এই দুই আমল মানুষের দারিদ্র্য ও পাপ এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে।
আজকের ব্যস্ত ও ভোগবাদী পৃথিবীতে যেখানে অনেকে কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতেও অনীহা প্রকাশ করেন, সেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় হাজার হাজার কিলোমিটার পায়ে হাঁটার এই সংকল্প নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
দুলাল হোসেন শেষ পর্যন্ত তার স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন কিনা—তা হয়তো সময়ই বলে দেবে। তবে তার এই যাত্রা ইতিমধ্যেই লাখো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।
জা.অর্থনীতি/ ওএফএ