সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: অনুকূল আবহাওয়া ও বড় ধরনের রোগবালাই না থাকায় চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরায় পাটের বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলার বিস্তীর্ণ বিল ও জলাশয়ে এখন চলছে পাট পচানোর ব্যস্ততা। তবে ভালো ফলনের পরও উৎপাদন খরচ, বাজারদর এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার প্রভাব নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকেরা।
সাতক্ষীরা সদর, কলারোয়া ও তালাসহ জেলার বিভিন্ন নিচু এলাকা ও বিলে এখন সারিবদ্ধভাবে পাট পচানো হচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টিপাত হওয়ায় খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় এবার পাট পচাতে কৃষকদের তেমন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। খেতের কাছাকাছি পানির ব্যবস্থা থাকায় পাট পরিবহনের অতিরিক্ত খরচও কমেছে।
পাটের আঁটি পানিতে ডুবিয়ে তার ওপর মাটির ঢেলা, কলাগাছ কিংবা কচুরিপানা দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে। কয়েক দিন পর পাট পচে গেলে আঁশ ছাড়িয়ে তা ধুয়ে শুকানোর কাজ শুরু করবেন কৃষকেরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাত উপজেলায় ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাজারদর ভালো থাকলে জেলার উৎপাদিত পাটের মোট বাজারমূল্য ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ।
উপজেলাভিত্তিক হিসাবে, সাতক্ষীরা সদরে ৫ হাজার ২০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৩ হাজার ২৫৫ হেক্টর, তালায় ৩ হাজার ১১০ হেক্টর, দেবহাটায় ২০ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১০১ হেক্টর, আশাশুনিতে ৯৫ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৯ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
কৃষকেরা বলছেন, অন্যান্য বছর এ সময়ে পাটে গোড়াপচা রোগ, পাতা শুকিয়ে যাওয়া ও বিছা পোকার উপদ্রব দেখা দিলেও এবার পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। ফলে ফলনও হয়েছে আশানুরূপ।
তালা উপজেলার পাটকেঘাটা গ্রামের কৃষক মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আগে পাটে নানা রোগবালাইয়ের কারণে ওষুধ দিতে দিতে নাভিশ্বাস উঠে যেত। এবার আবাদ ভালো হয়েছে। এক বিঘা জমিতে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হলেও বাজার ভালো থাকলে বিঘাপ্রতি ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার পাট বিক্রি করতে পারব বলে আশা করছি।’
একই উপজেলার আমতলাডাঙ্গা এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শুরু থেকেই কৃষি বিভাগের পরামর্শ পেয়েছি। সরকারের প্রণোদনার বীজ ও সারও পেয়েছি। এতে রোগবালাই কম হয়েছে, গাছও ভালো হয়েছে।’
তবে ভালো ফলনের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা রয়েছে কৃষকদের। জলবায়ু পরিবর্তন ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সাতক্ষীরায় কৃষি আবাদ দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, তীব্র রোদ ও মাটিতে লবণাক্ততার কারণে পাটবীজের অঙ্কুরোদ্গমও ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে সাতক্ষীরায় পাটের আবাদ কমেছে ১ হাজার ২১০ হেক্টর।
সদর উপজেলার কুশখালী গ্রামের কৃষক কামরুল হাসান বলেন, সারের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় এবার উৎপাদন খরচও বেড়েছে। গত বছর যেখানে বিঘাপ্রতি ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, এবার তা বেড়ে প্রায় ১৯ থেকে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। পাট পচানো ও আঁশ ছাড়ানোর পর বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছেন লবণসহিষ্ণু ‘দেশি পাট-৮’ জাত। গবেষকদের মতে, উপকূলের পতিত ও এক ফসলি জমিতে এ জাতের চাষ বাড়ানো গেলে বছরে দুটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে উপকূলীয় এলাকায় শস্যনিবিড়তাও বাড়বে।
বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত এ জাত কিছু এলাকায় সফল হলেও যথেষ্ট প্রচারের অভাবে এখনো তা ব্যাপকভাবে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততা বাড়ার আগেই শুষ্ক মৌসুমে স্বাদু পানি দিয়ে জমি প্রস্তুত করে আগাম বীজ বপন করা গেলে অঙ্কুরোদ্গমের হার প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছেন। লবণসহিষ্ণু দেশি পাট-৮ জাতকে জনপ্রিয় করতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন, কৃষক প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবসের আয়োজন করা হচ্ছে।’
কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চফলনশীল ও লবণসহিষ্ণু জাতের সরবরাহ, আধুনিক চাষাবাদ প্রযুক্তি, সরকারি প্রণোদনা এবং পাটের ন্যায্য বাজারদর নিশ্চিত করা গেলে সাতক্ষীরায় পাট চাষ আরও লাভজনক হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন জলাশয়ে পাট পচানো ও আঁশ শুকানোর কর্মযজ্ঞ ঘিরে কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
