অনলাইন ডেস্ক: আফগানিস্তানের সঙ্গে নিজের দুর্গম পাহাড়ি সীমান্তে হুট করে নতুন এক প্রশাসনিক অঞ্চল বা কাউন্টি গড়ে তুলেছে চীন। দেখে মনে হতে পারে এটি কেবলই একটি সাধারণ প্রশাসনিক রদবদল। কিন্তু ভূরাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হিসাব কষলে দেখা যাবে- এটি মূলত বিশ্ব মানচিত্র বদলে দেওয়ার মতো এক বিশাল পরিকল্পনার অংশ! শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অঞ্চলটিকে স্রেফ এক প্রান্তিক ও সংঘাতময় এলাকা হিসেবে চেনা হতো, আজ সেটাই হয়ে উঠছে বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন কেন্দ্রবিন্দু। ঠিক কী কারণে বেইজিং হুট করে এই বড় পদক্ষেপটি নিল? চলুন, জেনে নেওয়া যাক এর পেছনের সুদূরপ্রসারী কৌশল।
ঘটনাটি শুরু হয়েছে চীনের সিনচিয়াং প্রদেশের একটি অংশ ভেঙে নতুন ‘সেনলিং কাউন্টি’ গঠনের মাধ্যমে। অনেক বিশ্লেষক এটিকে শুধু নিরাপত্তা রক্ষার কৌশল ভাবলেও, এর আসল লক্ষ্য অনেক বড়। এটি মূলত বহুচর্চিত ‘ওয়াখান সড়ক’ বা ওয়াখান করিডর চালুর একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত। প্রায় এক শতাব্দী পর এই সড়কটি সম্পন্ন হলে আফগানিস্তান ও চীনের মধ্যে সরাসরি স্থল সংযোগ তৈরি হবে। শুধু তাই নয়, এর আগে ভারত সীমান্তবর্তী আকসাই চীন অঞ্চলেও নতুন কাউন্টি গঠনের মাধ্যমে বেইজিং বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তাদের পশ্চিম সীমান্ত এখন কেবল প্রতিরক্ষার জায়গা নয়, বরং এটি তাদের প্রধান ভূখণ্ড বা কোরের অংশ।
২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ওয়াখান করিডর দিয়ে সড়ক নির্মাণ তাদের কাছে এক জাতীয় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে। তাদের লক্ষ্য, এই পথ ধরেই চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য গড়ে তোলা। আর পরিসংখ্যান বলছে, এই পরিকল্পনা মোটেও অবাস্তব নয়। গত বছরই আফগানিস্তানের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য প্রায় ২৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এটিকে এক হাজার কোটি ডলারে উন্নীত করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি তাপী গ্যাস পাইপলাইন কিংবা ট্রান্স-আফগান রেলওয়ের মতো মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে আফগানিস্তান আর কোনো বাধা বা কোণঠাসা দেশ থাকবে না, বরং মধ্য এশিয়ার এক অন্যতম প্রধান ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হবে।
অবশ্য এই বিশাল সম্ভাবনার পথে বড় ধরনের কিছু নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। আইএসকে বা ইটিএম-এর মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং মাদক চোরাচালান রোধ করা বেইজিং ও কাবুলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এসব ঝুঁকি সত্ত্বেও চীন বসে নেই। বর্তমান বিশ্বে লোহিত সাগর বা পারস্য উপসাগরের জলপথগুলোতে যখন নানা অস্থিরতা চলছে, তখন বিশ্ব বিকল্প স্থলপথের সন্ধান করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ককেশাস ও মধ্য এশিয়া জুড়ে গড়ে ওঠা বাণিজ্য করিডরগুলো কেবল অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে না, বরং একসময়ের বিচ্ছিন্ন আফগানিস্তানকে আবার এশিয়ার হৃৎপিণ্ডে প্রতিষ্ঠিত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।
আফগান সীমান্তে চীনের এই নতুন প্রশাসনিক পদক্ষেপ কি মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বড় কোনো শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারবে?