জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নিউইয়র্কে থাকা বাংলাদেশি পরিবারগুলোর জীবন আসলে কেমন? বাইরে থেকে যতটা রঙিন মনে হয়, ভেতরের গল্পটা কি আসলেই ততটা সহজ? আকাশছোঁয়া বাসা ভাড়া আর বিল মেটাতে দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেন প্রবাসী বাবা-মায়েরা। কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যেও ছুটির দিনে দেশি খাবার আর আড্ডায় মেতে উঠে তারা বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কঠোর সংগ্রাম আর নিখাদ ভালোবাসার মধ্য দিয়েই তারা নিউইয়র্কে তৈরি করেছেন এক টুকরো বাংলাদেশ।
আমেরিকার স্বপ্নের শহর নিউইয়র্ক। আর এই শহরেরই জ্যাকসন হাইটস, জ্যামাইকা, পার্কচেস্টার কিংবা ব্রুকলিনের রাস্তায় হাঁটলে আপনার এক মুহূর্তের জন্যও মনে হবে না যে আপনি প্রবাসে আছেন। চারপাশের বাংলা সাইনবোর্ড, ইলিশ মাছের গন্ধ, আর পরিচিত আড্ডার আমেজ-সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক যেন প্রবাসী বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় বাড়ি। কিন্তু এই চাকচিক্যের আড়ালে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর আসল জীবনযাপন কেমন?
প্রথমেই আসে সংগ্রামের কথা। নিউইয়র্কের আকাশছোঁয়া বাসা ভাড়া আর জীবনযাত্রার খরচের সাথে তাল মেলাতে বাংলাদেশি পরিবারগুলোকে প্রতিদিন কড়া লড়াই করতে হয়। অধিকাংশ পরিবারেই গৃহকর্তা ট্যাক্সি বা রাইড শেয়ারিং চালান, রেস্তোরাঁয় কাজ করেন কিংবা কোনো গ্রোসারিতে ছোটখাটো চাকরি করেন। অন্যদিকে গৃহিণীরাও পিছিয়ে নেই-অনেকেই বিউটি পার্লার, ডে-কেয়ার কিংবা ঘরে তৈরি খাবারের ব্যবসা করে সংসারের চাকা সচল রাখতে সাহায্য করেন। অনেক পরিবারেই স্বামী-স্ত্রী দুজনেই দিনরাত শিফট ধরে কাজ করেন যাতে দিনশেষে সন্তানদের ভালো একটা ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া যায়।
তবে খরচের চাপ যতই থাকুক, নিউইয়র্কের বাংলাদেশি পরিবারের সামাজিক বন্ধন ভীষণ মজবুত। ছুটির দিনে জ্যামাইকা বা জ্যাকসন হাইটসের দেশি রেস্তোরাঁগুলোতে পরিবার নিয়ে খেতে যাওয়া, আড্ডা দেওয়া কিংবা বাংলা গ্রোসারি থেকে টাটকা শাকসবজি কেনা-এগুলো তাদের সপ্তাহের অন্যতম বড় আনন্দ।
আর এই পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় মনোযোগ থাকে তাদের সন্তানদের শিক্ষার ওপর। কঠোর পরিশ্রম করে পিতা-মাতারা চেষ্টা করেন সন্তানদের নিউইয়র্কের ভালো কোনো পাবলিক বা স্পেশালাইজড স্কুলে ভর্তি করাতে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নতুন প্রজন্ম এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইটি বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে নিউইয়র্কের পুলিশ বিভাগেও নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে।
সাংস্কৃতিক দিক থেকেও তারা দেশের শেকড়কে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। পহেলা বৈশাখ, ঈদ, কিংবা স্বাধীনতা দিবসে নিউইয়র্কের রাস্তাগুলোতে যেন মেলার আমেজ তৈরি হয়। শাড়ি-পাঞ্জাবি পরে সপরিবারে উৎসবে মেতে ওঠার এই দৃশ্য সত্যিই অনন্য।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্কে একটি বাংলাদেশি পরিবারের জীবন মানে একদিকে হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আর ডলারের হিসাব, অন্যদিকে নিজেদের কৃষ্টি-কালচার আর পরিবারকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকার এক অপূর্ব গল্প। তারা হয়তো নিউইয়র্কে থাকেন, কিন্তু তাদের হৃদয়টা সব সময়ই পড়ে থাকে বাংলাদেশে।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি