নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে বড় দরপতন হয়েছে দেশের পুঁজিবাজারে। গত সপ্তাহের শেষ দিন সাময়িক ঘুরে দাঁড়ানোর পর রোববার আবারও নিম্নমুখী সূচক। দিনভর বিক্রয় চাপ, বিশেষ করে শেষ ঘণ্টায় শেয়ার বিক্রির প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬৩ দশমিক ৯ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৭২২ পয়েন্টে। এ পতনের কারণ হিসেবে জ্বালানি সংকট, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগকে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল দিনের শুরুতে সূচক কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৮১৪ পয়েন্টে ওঠার পর সেখান থেকে ৯১ দশমিক ৮ পয়েন্ট হারায় ডিএসইএক্স। অর্থাৎ দিনের মাঝামাঝি সময় থেকে বিক্রির চাপ বাড়তে থাকে। ফলে দিন শেষে ডিএসইএক্স সূচক ৬৩ পয়েন্ট, ডিএসইএস ১৫ পয়েন্ট এবং ডিএস ৩০ সূচক ১৭ পয়েন্ট হারিয়েছে।
বাজারের সূচকভিত্তিক অবস্থানও দুর্বলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১ দশমিক ১ শতাংশ কমলেও ডিএস৩০ কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানির সূচক ডিএসএমইএক্স ১ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বড় ও প্রধান কোম্পানির শেয়ারে বিক্রির চাপ তুলনামূলক বেশি থাকলেও এসএমই বাজারে কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
গতকাল মোট লেনদেন আগের দিনের তুলনায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৭১১ কোটি টাকা হয়েছে। তবে লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে সূচকে পতন হওয়ায় বাড়তি লেনদেনের একটি বড় অংশ বিক্রিনির্ভর ছিল। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৬৭১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এ হিসাবে লেনদেন বেড়েছে ৩৯ কোটি ১৬ লাখ টাকা।
দুর্বলতা দেখা যায় লেনদেন হওয়া শেয়ারের হিসাবেও। এ দিন ৩৮৬টি কোম্পানির লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৩২টির দর বেড়েছে, কমেছে ৩২৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৩০টির। অর্থাৎ লেনদেন হওয়া অধিকাংশ শেয়ারই বিক্রির চাপে ছিল। অন্যদিকে লেনদেন হওয়া ৩৪টি মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৪টির দর বেড়েছে। কমেছে ২৩টির এবং অবশিষ্ট সাতটি ফান্ডের দর অপরিবর্তিত ছিল।
খাতভিত্তিক লেনদেনেও বাজারের বড় অংশ কয়েকটি খাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। মোট লেনদেনের ২৩ দশমিক ৩ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে ছিল টেক্সটাইল খাত। এরপরের অবস্থান সাধারণ বীমার, লেনদেন ১৩ দশমিক ৮ এবং ওষুধ ও রসায়ন খাত ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। প্রকৌশল খাতের অংশ ছিল ১০ শতাংশ।
তবে বেশি লেনদেন হওয়া খাতগুলোর বড় অংশই দিন শেষ করেছে দরপতন দিয়ে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতে ২ দশমিক ৫ শতাংশ, সাধারণ বীমায় ২ দশমিক ১ এবং জীবন বীমায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ দরপতন হয়, যা দিনের সবচেয়ে বড় খাতভিত্তিক পতনগুলোর মধ্যে ছিল। বিপরীতে সিরামিক খাত শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ ইতিবাচক রিটার্ন নিয়ে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঊর্ধ্বমুখী খাত ছিল।
মূল বাজারে দরপতনের চাপ থাকলেও সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ডিএসইর ব্লক মার্কেটে ৩০টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এ দিন ব্লক মার্কেটে ৩৬ কোটি ৫৬ লাখ ২ হাজার টাকা লেনদেন হয়। মোট ৯৭ লাখ ৬০ হাজার ৬৬৬ শেয়ার ৫৯টি লেনদেনের মাধ্যমে হাতবদল হয়েছে।
ব্লক মার্কেটের বড় লেনদেনের তালিকায় শীর্ষে ছিল সিটি ইন্স্যুরেন্স। এ কোম্পানির ৭ কোটি ২৫ লাখ ১৬ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা লাভেলোর শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৭ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার টাকার। আর ৬ কোটি ৯০ লাখ ১১ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ছিল শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) দিনজুড়ে ছিল বিক্রির চাপ। এতে সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৬১ পয়েন্ট বা প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে ১৫ হাজার ৬২৪ পয়েন্টে নেমেছে। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও দুর্বল অংশগ্রহণের ইঙ্গিত মিলেছে। এ দিন লেনদেন হওয়া ২১৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৮টির শেয়ারদর বেড়েছে।
১৪৯টির দর কমেছে এবং ২১টির অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ দরপতনের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দর বৃদ্ধির তুলনায় প্রায় তিন গুণ, যা বাজারজুড়ে বিক্রির প্রবণতা স্পষ্ট করে।
তবে সূচকের পতনেই থেমে থাকেনি এই বাজার। বাজারটিতে লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ দিন সিএসইতে মোট ৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের কার্যদিবসের ১৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার তুলনায় প্রায় ৬৬ শতাংশ কম। অর্থাৎ একদিকে অধিকাংশ শেয়ারদর কমেছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে। ফলে সিএসইতে দিনটির বাজারচিত্রে দরপতনের পাশাপাশি লেনদেনের তীব্র মন্দাভাবও স্পষ্ট হয়েছে।