আমিনুল ইসলাম মিঠু: প্রশান্ত মহাসাগরে তৈরি হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো। চলতি বছরের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের জানুয়ারির মধ্যে এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এর প্রভাবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খরা, পানির সংকট, দাবানল ও খাদ্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও সমাজ গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ইউরোপীয় কমিশনের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তন পরিষেবার পূর্বাভাসে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে এবং তা আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আবহাওয়া ও কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে এর প্রভাব আঞ্চলিক খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় পড়তে পারে। তবে বাংলাদেশে এল নিনোর কারণে ঠিক কী মাত্রায় বৃষ্টি, খরা বা তাপমাত্রার পরিবর্তন হবে—এ বিষয়ে প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট কোনো পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন: সুপার এল নিনো মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও তিমুর-লেস্তেতে খরার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি দ্বীপাঞ্চলেও ইতোমধ্যে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
আগের এল নিনোর অভিজ্ঞতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোতে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ২৩ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত।
২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় পাপুয়া নিউগিনিতে প্রায় ৭ লাখ মানুষ খাদ্যসংকটে পড়েছিল। একই সময়ে ইন্দোনেশিয়ার পিটল্যান্ডের দাবানল থেকে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়। হার্ভার্ড ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় ওই সময় দাবানলের ধোঁয়ার কারণে আঞ্চলিকভাবে প্রায় এক লাখ অতিরিক্ত মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়।
এবারের এল নিনো নিয়ে উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো এশিয়ার অর্থনীতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরস্পরনির্ভরশীল।
নিক্কেই এশিয়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, ইন্দোনেশিয়ার নিকেল উৎপাদন এবং ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার পাম তেল উৎপাদন খরা ও দাবানলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আরও পড়ুন: জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মুখোমুখি ১৮০ কোটি শিশু: ইউনিসেফ
মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষ কাজ করেন এবং বছরে প্রায় ৯৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হয়। ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিকেল উৎপাদন করে। আর ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া মিলে বিশ্বের প্রায় ৮২ শতাংশ পাম তেল উৎপাদন করে। অতীতের শক্তিশালী এল নিনোতে বৃষ্টির ঘাটতি ও দাবানলের কারণে পাম তেলের উৎপাদন ৮ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত কমেছিল।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে খাদ্য ও পণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে আঞ্চলিক বাজারে খাদ্যপণ্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ধানের উৎপাদন ২ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ফিলিপাইনেই ধানের উৎপাদন সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন কমার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশেও কি বাড়ছে ক্লাউডবার্স্টের ঝুঁকি?
পানির সংকটও বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন খাতে পানির চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এল নিনো-জনিত দাবানল থেকে তৈরি ধোঁয়া সীমান্ত পেরিয়ে আঞ্চলিক বায়ুদূষণ বাড়াতে পারে।
হার্ভার্ড ও কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের গবেষণার পাশাপাশি বর্তমান বিশ্লেষণে আশঙ্কা করা হয়েছে, এল নিনো-জনিত ধোঁয়ার কারণে ‘অত্যন্ত উচ্চমাত্রার দূষণ’-এর সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে বেড়ে ৭ কোটিতে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তাই সরাসরি আতঙ্কের চেয়ে আগাম প্রস্তুতিই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আঞ্চলিক খাদ্য উৎপাদন, আমদানি-নির্ভর পণ্যের সরবরাহ এবং সম্ভাব্য বাজার অস্থিরতার দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জলবায়ু পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এল নিনো মোকাবিলায় কিছু প্রস্তুতিও রয়েছে। আসিয়ানের বিশেষায়িত আবহাওয়া কেন্দ্র মৌসুমি পূর্বাভাস ও দৈনিক ধোঁয়া সতর্কতা দেয়। আসিয়ান দুর্যোগ মোকাবিলা সমন্বয় কেন্দ্রের রয়েছে তাৎক্ষণিক দুর্যোগ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্যোগ ঝুঁকি বিমা ব্যবস্থা এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের জরুরি দুর্যোগ অর্থায়নও চালু রয়েছে।
আরও পড়ুন: প্রচণ্ড গরম আনছে এল নিনো, জাতিসংঘের সতর্কতা
তবে এসব ব্যবস্থায় অর্থায়ন ও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্যোগ ঝুঁকি বিমা ব্যবস্থা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অর্থ ও জনবলের দিক থেকে দুর্বল। ২০২৫ সালে অঞ্চলটির দুর্যোগজনিত ক্ষতির মাত্র প্রায় ৮ শতাংশ বিমার আওতায় ছিল।
এ অবস্থায় এল নিনোর চূড়ান্ত পর্যায় আসার আগেই জরুরি তহবিল শক্তিশালী করা, দাবানল ও ধোঁয়া মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জলবায়ু বিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার তথ্য বলছে, এবারের এল নিনো শুধু আবহাওয়ার ওপর নয়, খাদ্য, পানি, বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য এখন থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
—জা.অর্থনীতি/এনজে
