অনলাইন ডেস্ক: গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া বিপন্ন প্রজাতির তিনটি রিংটেইল লেমুরের মধ্যে দুটির সন্ধান মিলেছে ভারতের গুজরাটে। প্রাণী দুটি এখন ভারতের শীর্ষ ধনকুবের অনন্ত আম্বানির বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণ প্রকল্প ‘বনতারা’য় রয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, পাচারের পর একাধিক ব্যক্তির হাত ঘুরে লেমুর দুটি সেখানে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হয়।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দৈনিক আজকের পত্রিকার এক প্রতিবেদনে জানা যায়, চুরি যাওয়া প্রাণী দুটি দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। তবে লেমুরগুলোর শরীরে মাইক্রোচিপ, স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর কিংবা সংরক্ষিত ডিএনএ প্রোফাইল না থাকায় সেগুলোর পরিচয় ও মালিকানা নিশ্চিত করে ফেরত আনার প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সিআইডির তদন্ত এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি থেকে লেমুর চুরি ও পাচারের পুরো ঘটনা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ গভীর রাতে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে তিনটি লেমুর চুরি হয়। এর মধ্যে দুটি পরে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। ঘটনার পরদিন সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ মামলা করে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।
তদন্তে উঠে এসেছে, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া নিরাপত্তাকর্মী নিপেন মাহমুদের সহযোগিতায় জুয়েল নামের এক বন্য প্রাণী চোরাকারবারি লেমুরগুলো পার্ক থেকে বের করে নেন। পরে বস্তায় করে প্রাণীগুলো একটি বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে লেমুরগুলোর ছবি ও ভিডিও ধারণ করে ভারতের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয়।
একপর্যায়ে কলকাতার বাবলু ও মুম্বাইয়ের শিপলু নামের দুই ব্যক্তি ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশে আসেন। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন দেলোয়ার ও তপন নামের দুই ব্যক্তি। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি প্রাপ্তবয়স্ক লেমুর ও একটি শাবক ১৭ লাখ টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়। অন্য শাবকটির দাম ঠিক করা হয়েছিল ৩ লাখ টাকা।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, স্থানীয় এক সীমান্ত লাইনম্যানের সহযোগিতায় দুটি লেমুরকে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠানো হয়। এরপর কয়েক দফা হাতবদলের মাধ্যমে প্রাণী দুটি গুজরাটের জামনগরে পৌঁছায়।
পরে ভারতীয় ক্রেতারা লেমুর দুটি ‘বনতারা’ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৪৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
বনতারায় থাকা লেমুর দুটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি বাংলাদেশের তদন্তকারীদের নজরে আসে। ছবির সঙ্গে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে চুরি হওয়া লেমুরগুলোর মিল খুঁজে পাওয়ার পর প্রাণী দুটি দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণী দুটির শনাক্তকরণ ব্যবস্থা না থাকা। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে পাচার হওয়া বন্য প্রাণীর মালিকানা ও পরিচয় নিশ্চিত করতে মাইক্রোচিপ, নিবন্ধন নম্বর এবং ডিএনএ প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঁচ বছরের বেশি সময় থাকার পরও ওই লেমুরগুলোর ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি তাদের শরীরে মাইক্রোচিপ বা কোনো স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ ব্যবস্থাও ছিল না।
ফলে গুজরাটে থাকা লেমুর দুটি যে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকেই চুরি হয়েছিল, তা বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে দেশে থাকা একটি শাবক লেমুরের ডিএনএ প্রোফাইল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ওই নমুনার সঙ্গে গুজরাটে থাকা দুটি লেমুরের জেনেটিক সম্পর্ক মিলিয়ে দেখার চেষ্টা চলছে।
লেমুর চুরি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক সুনীল দাশ বলেন, ২০১৮ সালের আগস্টে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে বিরল প্রজাতির লেমুর দুটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। শুল্ক কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ার পর প্রাণীগুলোকে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। সেখান থেকেই আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের নজরে পড়ে লেমুরগুলো।
তাঁর ভাষ্য, পরে নিরাপত্তাকর্মীর সহযোগিতায় লেমুরগুলো চুরি করে সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাচার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং অধিকাংশ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
এর আগে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানে বিরল পাখি ও প্রাণীর একটি বড় অবৈধ চালান আটক করা হয়েছিল। ওই চালানে লাভবার্ড, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, ময়ূরসহ এক জোড়া লেমুর ছিল। পরে আটক প্রাণীগুলোর একটি অংশ গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়।
তদন্তে জানা যায়, লেমুরগুলোকে পাখি হিসেবে ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। পরে সাফারি পার্কে থাকা অবস্থায় ওই জোড়া লেমুরের দুটি শাবক জন্ম নেয়। একপর্যায়ে বাবা লেমুরটি মারা গেলে মা লেমুর ও দুটি শাবক পার্কে থেকে যায়। পরবর্তী সময়ে এই তিনটির মধ্য থেকেই দুটি চুরি করে ভারতে পাচার করা হয়।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, লেমুর চুরি ও পাচারের ঘটনায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছয়জন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
অন্যদিকে দেলোয়ার ও জহির মিয়া নামের দুই আসামির জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রেপ্তারের পর জামিনে বেরিয়ে তাঁরা আত্মগোপনে চলে যান। তদন্তে জহির মিয়ার বিরুদ্ধে এর আগে ম্যাকাও পাখি চুরির ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এখন গুজরাটে থাকা লেমুর দুটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে ইন্টারপোলের সহযোগিতার পাশাপাশি বৈজ্ঞানিকভাবে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
—জা.অর্থনীতি/জেআরটি