নিকলী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি: ঢাকঢোলের বাদ্য, মাঝিদের হইহুল্লোড় আর ছন্দ মিলিয়ে বইঠা চালানোর শব্দে মুখর হয়ে উঠেছিল কিশোরগঞ্জের নিকলীর চৈল্যাতির হাওর। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ দেখতে সকাল থেকেই হাওরের দুই পাড়ে জড়ো হন হাজারো মানুষ। নৌকা ভাড়া করে কেউ হাওরের মাঝখান থেকে, আবার কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে পাড়ে দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন জমজমাট এ আয়োজন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নিকলী উপজেলার চৈল্যাতির হাওর ও আশপাশের এলাকায় এ নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়।
যুবসমাজকে মাদক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রেখে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী করা এবং হাওরাঞ্চলের হারিয়ে যেতে বসা লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখার লক্ষ্যেই নাগরিক কমিটির উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।
কিশোরগঞ্জের নিকলী ছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে মানুষ নৌকাবাইচ দেখতে আসেন। ফলে চৈল্যাতির হাওর ও আশপাশের এলাকা পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়। নিকলী উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল অতিথিদের আনাগোনা।
কটিয়াদি উপজেলার করগাঁও এলাকা থেকে ৩০ জনের সঙ্গে নৌকায় করে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছেন মোবারক হোসেন। ২৯ বছর বয়সী মোবারক জানান, এর আগে কখনো নৌকাবাইচ দেখা হয়নি তার। এবারই প্রথম। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বাইচ চলবে বলে নৌকার মধ্যেই দুপুরের খাবারের আয়োজন করেন তারা। নৌকাতেই রান্না করেন দুপুরের খাবার।
বাইচ শুরু হতেই বদলে যায় হাওরের পরিবেশ। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা নৌকাগুলো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। জয়ের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে বইঠা চালাতে থাকেন মাঝিরা। কখনো একটি নৌকা এগিয়ে যায়, পরক্ষণেই অন্যটি তাকে পেছনে ফেলে সামনে চলে আসে। মাঝিদের হাঁকডাক আর ঢাকঢোলের তালে জমে ওঠে তীব্র প্রতিযোগিতা।
নদীর দুই পাড় থেকে দর্শকেরা পছন্দের নৌকাকে উৎসাহ দিতে হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখর করে তোলেন চারপাশ। অনেকে মুঠোফোনে ধারণ করেন নৌকাবাইচের দৃশ্য। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে আসা দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষও নৌকা ভাড়া করে হাওরের মাঝখান থেকে প্রতিযোগিতা উপভোগ করেন।
হাওর-অধ্যুষিত নিকলী উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক বহু পুরোনো। বর্ষায় বিস্তীর্ণ হাওর পানিতে তলিয়ে গেলে নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই নৌকাকে ঘিরেই যুগের পর যুগ ধরে চলে আসছে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য। তবে আধুনিকতার প্রভাবে আগের মতো নিয়মিত এ ধরনের আয়োজন না হওয়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার এই লোকজ সংস্কৃতি।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর বিজয়ী দলের হাতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে তুলে দেওয়া হয় একটি ফ্রিজ। দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় টেলিভিশন এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের হাতে তুলে দেওয়া হয় মোবাইল ফোন। পুরস্কার পাওয়ার পর বিজয়ী দল ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে দেখা যায় উচ্ছ্বাস।
স্থানীয় বাসিন্দা ইসলাম উদ্দিন বলেন, একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি উৎসব-আয়োজনে লোকজ সংস্কৃতির ছোঁয়া থাকত। জারি, সারি ও ভাটিয়ালি গান, লাঠিখেলা, কাবাডি ও নৌকাবাইচ ছিল গ্রামীণ মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। সময়ের সঙ্গে এসব আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। দীর্ঘদিন পর নৌকাবাইচের এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।
নৌকাবাইচ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে উদ্বোধক ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ ভিপি সোহেল। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তারী কাদেরী, নিকলী উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট বদরুল মোমেন মিঠু, সাধারণ সম্পাদক আতিকুল ইসলাম তালুকদার হেলিম, নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনাল-২-এর পিপি অ্যাডভোকেট এম এ সাজ্জাদুল হক, নিকলী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা চান্দালী মেম্বার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সাদ্দাম হোসেন সাদু এবং অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মো. মাহবুব।
নৌকাবাইচ শুরুর আগে অতিথিরা বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকার সম্পর্ক গভীর। ঘোড়াউত্রা নদীর এই নৌকাবাইচ শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়, লোকজ ঐতিহ্য ধরে রাখারও একটি প্রয়াস।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি