মৌলভীবাজার প্রতিনিধি: ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখে শখ জেগেছিল হলুদ তরমুজ চাষের। সেই শখ থেকেই শুরু। এখন জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ি গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা খোর্শেদ আলমের প্রায় ৩ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে হলুদ তরমুজ। পতিত জমিতে চাষ করে মাত্র তিন মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় করে নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে দেখা যায়, খোর্শেদ আলমের তরমুজবাগানে প্রতিদিনই ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। সিলেট, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসছেন হলুদ তরমুজ দেখতে। কেউ কেউ পরিবারের জন্য একসঙ্গে ১০ থেকে ১৫টি তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেকের কাছেই এটি ছিল প্রথমবারের মতো হলুদ তরমুজ দেখা ও খাওয়ার অভিজ্ঞতা।
খোর্শেদ আলম জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে ইউটিউবে হলুদ তরমুজ চাষের একটি ভিডিও দেখে তার আগ্রহ তৈরি হয়। পরে পরীক্ষামূলকভাবে ৬ শতাংশ জমিতে বীজ বপন করেন। প্রথমে পারিবারিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে চাষ করলেও ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা দেখে বাণিজ্যিকভাবে চাষের সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
২০২২ সালে জুড়ীতে প্রথমবার পরীক্ষামূলকভাবে হলুদ তরমুজ চাষ করে সফল হন খোর্শেদ। এরপর প্রতিবছর তার বাগান ঘিরে স্থানীয়দের আগ্রহ বাড়তে থাকে। সেই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার নিজের পতিত প্রায় ৩ বিঘা জমিতে ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ করেছেন তিনি।
গত বছরের ১৮ নভেম্বর সিলেট অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জুড়ীর সহযোগিতায় ডোমাবাড়ি কচুরগুল ব্লকে ৩৩ শতাংশ জমিতে আধুনিক প্রযুক্তিতে এ চাষ শুরু করেন তিনি।
খোর্শেদ আলম বলেন, গত বছর তরমুজ চাষে প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। তরমুজ বিক্রি করে পেয়েছেন প্রায় ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে প্রায় ৫ লাখ টাকা আয় হয়েছে। চলতি বছরও প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আশা করছেন ৮ থেকে ৯ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবেন। শীত মৌসুমের এ ফসল মাত্র তিন মাসেই ফলন দেয়। জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়াও তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী।
একসময় ধান কাটার পর যে জমি বছরের পর বছর পতিত পড়ে থাকত, সেই জমিই এখন দিগন্তজোড়া সবুজ তরমুজে ভরে উঠেছে। খোর্শেদ বলেন, জুড়ী উপজেলায় হাজার হাজার বিঘা জমি পতিত পড়ে রয়েছে। শিক্ষিত বেকার যুবকেরা চাইলে এসব জমিতে চাষাবাদ করে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
হলুদ তরমুজের অন্যতম আকর্ষণ এর ভেতরের রং। বাইরে সবুজ হলেও কাটার পর ভেতরে দেখা যায় টকটকে হলুদ। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি এটি মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যেও বেশ আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সিলেট থেকে তরমুজবাগান দেখতে আসা দর্শনার্থী রুমানা আক্তার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাগানের ছবি দেখে আগ্রহ তৈরি হয়। এত দূর থেকে এসেছেন খোর্শেদকে উৎসাহ দিতে। তরুণ বয়সে এমন উদ্যোগ সত্যিই চমক লাগার মতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, ল্যানফাই জাতের হলুদ তরমুজ চাষ জুড়ীতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রতিদিন শত শত কৃষক ও দর্শনার্থী এটি দেখতে আসছেন। এটি উচ্চমূল্যের হাইব্রিড জাত। উৎপাদন পদ্ধতি দেশি তরমুজের মতোই। এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন এ ও সি রয়েছে এবং ফলটি বেশ মিষ্টি।
তিনি আরও বলেন, জুড়ীর মাটি ও আবহাওয়া হলুদ তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তা ও মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ এ সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। খোর্শেদ আলমের মতো কোনো শিক্ষিত বেকার যুবক আগ্রহী হলে তাকে সফল করতে কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
স্থানীয় কৃষিপ্রেমীরাও খোর্শেদের উদ্যোগের প্রশংসা করছেন। তাদের মতে, তার সাফল্য দেখে আগামীতে আরও অনেকে হলুদ তরমুজ চাষে আগ্রহী হবেন।
খোর্শেদ আলম বলেন, আগামী বছর আরও জমিতে হলুদ তরমুজ চাষ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন কিছু ফসলও যুক্ত করতে চান তিনি। তার লক্ষ্য, জুড়ীকে কৃষিতে আরও সমৃদ্ধ একটি এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা।
একটি ইউটিউব ভিডিও থেকে জন্ম নেওয়া শখ, সঙ্গে সাহস ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতা- এই তিনের সমন্বয়ে পতিত জমিতে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছেন খোর্শেদ আলম। তার উদ্যোগ দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ থাকলে পতিত জমিও হয়ে উঠতে পারে তরুণদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি