জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: নতুন পে স্কেলে সর্বোচ্চ মূল বেতন প্রায় দ্বিগুণ হলো, সর্বনিম্ন বেতন বেড়ে দাঁড়াল ২০ হাজার টাকায়। দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ সালের এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলেও কর্মচারীদের দীর্ঘশ্বাস কিন্তু কমেনি। কিন্তু কেন? কেন প্রতিটা নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার পরপরই শুরু হয় নতুন করে জীবনযাত্রার মান আর বাজারদর নিয়ে চিন্তা? তবে কি শুধু বেতন বাড়ানোই সমস্যার শেষ সমাধান নয়?
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এই বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তন সরকারি কর্মচারীদের স্বস্তি দেওয়ার কথা থাকলেও, বাজার বাস্তবতা ও অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ভিন্ন কথা বলছে। সমস্যাটা তৈরি হয় মূলত সময়ের ব্যবধানে। ১০ বা ১২ বছর পরপর যখন একটি নতুন পে কমিশন আসে, ততদিনে বাজারের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বর্তমান বেতনকে পেছনে ফেলে অনেক দূর এগিয়ে যায়।
একটা জরুরি বিষয় এখানে মনে রাখা প্রয়োজন-মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থ কিন্তু পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা ধীর হওয়া। ফলে এক দশকে যে দাম একবার চড়ে বসেছে, তা আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না। এই দীর্ঘ ব্যবধানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে আর্থিক চাপে পড়েন, তা সামাল দিতেই আবার নতুন পে স্কেলের দাবি ওঠে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারতের মতো দেশে নির্দিষ্ট সময় পরপর কমিশন হয়, আবার যুক্তরাজ্যে স্বাধীন Pay Review Body বা বেতন পর্যালোচনা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত বিরতিতেই সরকারি পেশাজীবীদের বেতন মূল্যায়নের সুপারিশ করা হয়। অর্থাৎ, বহু বছর পর পর একবারে বড় বেতন না বাড়িয়ে নিয়মিত অর্থনৈতিক সূচকের সাথে তাল মিলিয়ে বেতন সমন্বয়ের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা সেখানে বিদ্যমান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এমন একটি স্থায়ী বা নিয়মিত বেতন সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব কি না-সেটি এখন বড় আলোচনার বিষয়। তবে শুধু 'স্থায়ী পে কমিশন' বললেই সমস্যার সমাধান হয় না। এর সাথে কিছু বড় প্রশ্ন থেকে যায়-এটি কি একটি নিয়মিত স্বাধীন পর্যালোচনা ব্যবস্থা হবে? বেতন বাড়ানোর সূত্র কী হবে-শুধু মূল্যস্ফীতি নাকি রাজস্ব আদায় ও মাথাপিছু আয়ও বিবেচনায় থাকবে? আর এই পরিবর্তন কি স্বয়ংক্রিয় হবে, নাকি সরকারের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে?
হঠাৎ করে ১২ বছর পর বিশাল বাজেট বরাদ্দ করে বেতন দ্বিগুণ করার চেয়ে যদি মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয় এবং সার্বিক অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করে প্রতি বছর বা নিয়মিত বিরতিতে একটি স্বচ্ছ বিধিমালার মাধ্যমে বেতন পর্যালোচনা করা হতো, তবে সেটি কর্মচারীদের জন্য যেমন পূর্বানুমেয় হতো, সরকারের জন্যও বাজেট ব্যবস্থাপনা সহজ হতো।
নতুন পে স্কেল ২০২৬ সাময়িকভাবে একটি সমাধান দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাজারদরের গতিশীলতার সঙ্গে স্থির বেতন ব্যবস্থার যে বৈষম্য, তার স্থায়ী সমাধান নিয়ে চিন্তার সময় এখনই। মূল প্রশ্ন হলো-আমরা কি বারবার দীর্ঘ অপেক্ষার পর বড় ধাক্কার পে স্কেলেই আটকে থাকব, নাকি একটি পরিবর্তনশীল ও টেকসই বেতন সমন্বয়ের পথে হাঁটব?
১২ বছর পর ২০২৬ সালে এসে নতুন পে স্কেল পেলেন সরকারি কর্মচারীরা! সর্বনিম্ন মূল বেতন বেড়ে ২০ হাজার আর সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হলো। দারুণ খবর, তাই না? কিন্তু খেয়াল করে দেখেছেন-পে স্কেল আসার কয়েক মাসের মধ্যেই কিন্তু সেই পুরনো বাজারের চাপ আর দুশ্চিন্তা ফিরে আসে! কেন জানেন? কারণ বাজারদর বাড়ে প্রতিদিন, আর আমাদের বেতন কাঠামোর পরিবর্তন আসে প্রতি এক দশকে একবার! এই দীর্ঘ ব্যবধান না কমিয়ে শুধু বেতন বাড়িয়ে কি আসল সমস্যার সমাধান সম্ভব? আপনার মতামত কমেন্টে জানান!
মূল্যস্ফীতি কমলে কি বাজারের জিনিসপত্রের দাম কমে যায়? মোটেও না! এর মানে শুধু দাম বাড়ার গতিটা একটু কমেছে। আর ঠিক এই কারণেই ১০-১২ বছর পর একটা নতুন পে স্কেল দিলেও কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান খুব বেশি বদলায় না। ভারত বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে কিন্তু বহু বছর পর একবারে না বাড়িয়ে নিয়মিত বেতন পর্যালোচনা করা হয়। বাংলাদেশেও কি নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বয়ংক্রিয় বা স্থায়ী বেতন সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করা উচিত? আপনার কী মনে হয়, কোনটা বেশি কার্যকর?
—জা. অর্থনীতি/এলএটি
