খুলনা প্রতিনিধি: খুলনায় ভাত চুরি করে খাওয়ার তুচ্ছ অভিযোগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে মেসের ছাদে হাত-পা বেঁধে বেধড়ক পিটিয়ে হত্যার পর চারতলার ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলাম নগর রোডের এক চারতলা মেসে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
নিহত ছাত্রের নাম মো. আজমুল হোসেন (২১)। তিনি চুয়াডাঙ্গা জেলার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কৃষক কুতুব উদ্দিন ও আসমা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। তিনি নগরীর বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং মাত্র ১০ দিন আগে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হয়েছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খানজাহান আলী হলের পেছনের ইসলাম নগর রোডের ওই চারতলা ভবনে ৫০ থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থী মেস করে থাকেন। এক বছর ধরে ওই মেসের ৪ তলায় ডি-৮ নম্বর কক্ষে থাকতেন আজমুল। শুক্রবার রাতে একই মেসের বাসিন্দা ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র মেস ম্যানেজার মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেহেদীসহ মেসের অন্য ছাত্র ও বহিরাগত কিছু যুবক রাত ১২টার পর আজমুলকে ভাত চুরির অপবাদ দিয়ে চারতলার ছাদে নিয়ে বেধড়ক মারধর শুরু করেন।
মেসের পেছনের ভবনের এক নারী জানান, রাত পৌনে ১টার দিকে বিকট শব্দ শুনে গলি থেকে তারা মুমূর্ষু অবস্থায় আজমুলকে উদ্ধার হতে দেখেন। পরে অভিযুক্ত ছাত্ররা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে আজমুলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আজমুলের মৃত্যুর খবর শোনামাত্রই অভিযুক্ত সহপাঠী ও অন্য ছাত্ররা হাসপাতাল জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, নিহতের শরীরে অসংখ্য মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং তার দুটি পাই ভাঙা ছিল।
এদিকে চুয়াডাঙ্গায় নিহতের পিতা কুতুব উদ্দিন আকুল কণ্ঠে জানান, শুক্রবার রাত ৯টায় আজমুল ফোন দিয়ে ভালো থাকার কথা বললেও রাত ১২টার পর আজমুলের মোবাইল নম্বর থেকেই অন্য এক যুবক ফোন করে ১ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অন্যথায় ছেলেকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না বলে হুমকি দেয়। সকালের দিকে খুলনা পৌঁছে তিনি সন্তানের লাশ দেখতে পান। সন্তান হারিয়ে হরিণটানা থানায় অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে অসহায় বাবা বলেন, "আমরা গরীব মানুষ, কার কাছে বিচার চাইব? বিচার পাব না। বিচার আল্লাহর কাছেই ছেড়ে দিলাম।"
আজ দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, ৮টি রুমের মধ্যে ৭টি কক্ষেই তালা ঝুলছে। ছাদের ছ্যাদলা ও ধূলাবালিতে ধস্তাধস্তির স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে। মেসের গৃহকর্মী ফাতেমা জানান, মারধরের সময় বারণ করা হলেও ছাত্ররা শোনেনি।
এ বিষয়ে হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পরিবার লিখিত অভিযোগ না দিলেও পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করবে এবং জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করা হবে।" খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির জানান, এ হত্যাকাণ্ডে আইনগত সব পদক্ষেপ জোরদার করা হচ্ছে।
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. কানাই লাল সরকার বলেন, "আজমুল মাত্র ১০ দিন আগে আমাদের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। আমরা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলেছি। ভুক্তভোগী পরিবারকে সব ধরনের আইনি সহায়তা দেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।"
—জা. অর্থনীতি/এলএটি