কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি: বিশ্বজুড়ে যখন নিরাপদ বাসস্থান ও আবাসনের অধিকারের কথা বলে বিশ্ব বসতি দিবস পালিত হচ্ছে, তখন কিশোরগঞ্জে এক বিধবার রাত কাটছে খোলা আকাশের নিচে।
স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারানো সুফিয়া আক্তারের অভিযোগ, নিজের নামে জমির রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও দেবর ও স্বজনদের বাধা, হুমকি ও দখলের মুখে তিনি এখন বসতভিটা ছাড়া।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার চৌদ্দশত এলাকার বাসিন্দা সুফিয়া আক্তার ৪ মেয়েকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আকুতি জানাচ্ছেন।
তার অভিযোগ, দীর্ঘ আট বছর ধরে চলা বাধা ও হুমকির একপর্যায়ে তার বসতঘরটি ভেঙে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুফিয়ার বসতঘরটি যেখানে ছিল, সেখানে এখন একটি নতুন টিনশেড ঘর।
সুফিয়ার অভিযোগ, তার দেবর নিজাম উদ্দিন ঘরটি নির্মাণ করেছেন। বাড়ির সামনে টিন দিয়ে একটি গেটও তৈরি করে তালা দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি ভেতরে ঢুকতে না পারেন।
বাংলাদেশি ভেবে নিজ দেশের ২ নাগরিককে গুলি করল বিএসএফ
রেকর্ড ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চৌদ্দশত মৌজার ১১৭০ নম্বর খতিয়ানের বিভিন্ন দাগে সুফিয়ার প্রয়াত স্বামী নুরুন্নবী, দেবর নিজাম উদ্দিনসহ অন্য ওয়ারিশদের মোট ১ একর ২৭ শতাংশ জমি ছিল। নুরুন্নবী ও তার ছেলে মবিনের মৃত্যুর পর বিআরএস ২৫-২৪৯৩ নম্বর খতিয়ানে সুফিয়া ও তার ৪ মেয়ে রেবা সুলতানা, মালা আক্তার, রত্না আক্তার ও স্বপ্নার নামে মোট ৩০ শতাংশ জমি রেকর্ডভুক্ত হয়।
সুফিয়া আরও বলেন, কাগজে ৩০ শতাংশের মালিক হলেও বাস্তবে মাত্র ২ শতাংশ জায়গায় একটি ঘর তোলার সুযোগও তিনি পাচ্ছেন না।
তার অভিযোগ, দেবর নিজাম উদ্দিন, চাচাতো দেবর হারিছ মিয়া ও নিজাম উদ্দিনের জামাতা মামুন মিয়া বসতঘর ভেঙে মালামাল নিয়ে তাকে উচ্ছেদ করেছেন। বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে নিজাম উদ্দিন বলেন, তার ভাই ও ভাতিজা মারা গেছেন এবং ওই জমিতে সুফিয়ার কোনো অধিকার নেই। সুফিয়া বর্তমানে যে জায়গায় থাকেন, সেটিও তাঁর বলে দাবি করেন তিনি।
নিজাম উদ্দিনের জামাতা মামুন মিয়া বলেন, সুফিয়া আইন-আদালতের পেছনে ঘুরে কী করবেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সুফিয়ার প্রতি এত মায়া থাকলে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আশ্রয় দেওয়া হোক।
চৌদ্দশত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতাহার আলী বলেন, স্বামী ও সন্তান হারিয়ে সুফিয়া সম্পূর্ণ অসহায়, ৪ মেয়েকে নিয়ে মানবিক সংকটে আছেন।
তার ভাষ্য, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে একাধিকবার সালিশ হয়েছে এবং কাগজপত্র দেখে সুফিয়ার পক্ষে সিদ্ধান্তও দেওয়া হয়েছে, কিন্তু অভিযুক্তরা তা মানেননি।
বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান মারুফ সরেজমিনে সুফিয়ার বাড়ি পরিদর্শন করেন। তিনি স্থানীয় চেয়ারম্যান ও জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খানকে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিতে বলেন।
জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান জানান, উভয়পক্ষকে জেলা পরিষদে ডেকে তাদের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা হয়েছে। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন থাকায় আদালতের নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সুফিয়াকে বর্তমান অবস্থানেই থাকতে বলা হয়েছিল।
তবে সুফিয়ার অভিযোগ, জেলা পরিষদের বৈঠক থেকে ফেরার পরই তাকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।
কিশোরগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী দোলন কুমার আচার্য্য বলেন, সুফিয়ার পক্ষে কয়েকবার উকিল দরবার হয়েছে। কাগজপত্র অনুযায়ী সুফিয়া জমির মালিক, কিন্তু দেবররা সেখানে তাকে ঘর তুলতে দিচ্ছেন না।
এখন নিজের কোনো আশ্রয় না থাকায় প্রবাসী মেয়ের ২ শিশুকন্যাকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচেই দিন-রাত কাটছে সুফিয়ার। বিবাহিত মেয়েদের সংসারে আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকলেও তিনি নিজের ভিটায় ফিরে একটি ছোট ঘরে থাকতে চান।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সুফিয়া বলেন, নিজের জায়গায় ছোট একটি ঘর করে শান্তিতে থাকতে চাই। আর কিছু চাই না।
এটি গ্রামীণ পর্যায়ে জমি নিয়ে বিরোধ, আইনি জটিলতা ও সামাজিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতারও একটি চিত্র। বিশ্ব বসতি দিবসে নিরাপদ আবাসনের অধিকার নিয়ে যখন নানা কর্মসূচি হচ্ছে, তখন এই ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
দ্রুত আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপে সুফিয়ার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করে তার মাথার ওপর একটি নিরাপদ ছাদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
—জা. অর্থনীতি/এনজে
