তারকা হলেই কি টেকে না সংসার? প্রীতম–শেহতাজ থেকে যে প্রশ্ন
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

অনলাইন ডেস্ক: একদিকে ক্যারিয়ারে সাফল্য, জনপ্রিয়তা, কোটি মানুষের ভালোবাসা, অন্যদিকে ব্যক্তিজীবনে ভাঙনের খবর। প্রীতম হাসান–শেহতাজ মনিরা হাশেমের বিচ্ছেদের ঘোষণা আবারও সামনে এনেছে পুরোনো সেই প্রশ্নটি, তারকাদের বিয়ে কি টেকে না? নাকি জনপ্রিয়তার আড়ালে দাম্পত্যের সংকটগুলোই আমরা দেখতে পাই না?

বাস্তবতা হলো, তারকা হওয়া নিজে কোনো বিবাহবিচ্ছেদের কারণ নয়। বরং সম্পর্কের ভেতরের বোঝাপড়া, জীবনযাপনের পরিবর্তন, কাজের চাপ, প্রত্যাশার অমিল কিংবা যোগাযোগের সংকট-এসব কারণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রীতম–শেহতাজ: প্রায় এক দশকের সম্পর্কের ইতি

প্রায় এক দশকের সম্পর্কের পর আলাদা পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রীতম ও শেহতাজ। ২০১৭ সালে প্রীতমের ‘জাদুকর’ গানের মিউজিক ভিডিওতে কাজ করতে গিয়ে তাদের পরিচয়। সেখান থেকে প্রেম, এরপর ২০২২ সালের ২৯ অক্টোবর বিয়ে।

কিন্তু ৪ অক্টোবর রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পোস্টে দুজনই জানান, পারস্পরিক বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্যের কারণে আলাদা হয়ে যাওয়াই তাদের জন্য ভালো হবে। দুজনই বলেন, সিদ্ধান্তটি হঠাৎ নেওয়া নয়। নিজেদের মধ্যে আলোচনা এবং পরিবারের সমর্থন ও সম্মতি নিয়েই তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। বর্তমানে বিবাহবিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখানে তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করেননি। বরং একে অপরের প্রতি সম্মান ও শুভকামনা থাকার কথাই জানিয়েছেন।

আলোচিত তারকা সংসারে ভাঙা

এ ঘটনা বাংলাদেশের শোবিজে নতুন নয়। তাহসান খান ও মিথিলার ১১ বছরের সংসারের বিচ্ছেদও একসময় ভক্তদের বিস্মিত করেছিল। মিথিলা তখন জানিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে দুজনের জীবন-লক্ষ্য ও চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছিল। প্রায় দুই বছর আলাদা থেকেও তারা সমস্যা মেটানোর চেষ্টা করেছিলেন; শেষ পর্যন্ত বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন।

অপূর্ব ও নাজিয়া হাসান অদিতির প্রায় ৯ বছরের দাম্পত্যেরও ইতি হয় ২০২০ সালে। সে সময় সংবাদমাধ্যমে তাদের বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে বনিবনা না হওয়ার কথা আসে।

হুমায়ুন ফরীদি ও সুবর্ণা মুস্তাফার সংসারও ২০০৮ সালে ভেঙে যায়। আর হুমায়ূন আহমেদ ও গুলতেকিনের দীর্ঘ দাম্পত্যের বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৫ সালে। পরীমণি ও শরীফুল রাজের দাম্পত্য সংকট ও বিচ্ছেদও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে।

কিন্তু কেন ভাঙে সংসার?

এসব সম্পর্কের ভাঙনের পেছনে আসলে কোন কারণ থাকে? প্রথম কারণ, চাওয়ার অমিল। বিয়ের সময় দুজন মানুষের স্বপ্ন, ক্যারিয়ার বা জীবনযাপনের পরিকল্পনা এক রকম থাকলেও কয়েক বছর পর তা বদলে যেতে পারে।

তাহসান–মিথিলার ক্ষেত্রেও উঠে এসেছিল সময়ের সঙ্গে জীবন-লক্ষ্যের পার্থক্যের বিষয়টি। প্রীতম–শেহতাজও বলেছেন, সময়ের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়ার কিছু বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শুধু ভালোবাসা নয়, দুজনের বদলে যাওয়া মানুষটাকেও নতুন করে বোঝার সক্ষমতা দরকার।

ক্যারিয়ার যত বড়, সময়ের সংকটও তত?

দ্বিতীয় বড় কারণ হলো, কাজ ও ব্যক্তিজীবনের সংঘাত। তারকাদের জীবন সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি প্রকাশ্য। শুটিং, গান, অনুষ্ঠান, ভ্রমণ, প্রচারণা—কাজের সময় অনেক সময় নির্দিষ্ট থাকে না।

গবেষণাতেও দেখা গেছে, কাজের চাপ ও পারিবারিক দায়িত্বের সংঘাত দাম্পত্য সন্তুষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশি দ্বৈত-ক্যারিয়ার দম্পতিদের ওপর গবেষণাতেও কাজ–পরিবারের সংঘাতের বিষয়টি উঠে এসেছে।

আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, কাজের অতিরিক্ত চাপ ও মানসিক ক্লান্তি দাম্পত্য সম্পর্কেও অসন্তুষ্টি তৈরি করতে পারে।

তাই সমস্যা শুধু সময় কম পাওয়া নয়, সময় পেলেও সেই সময়টায় মানসিকভাবে একে অপরের পাশে থাকা যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রিয়তার চাপও কি সম্পর্ককে কঠিন করে?

তারকা দম্পতির ক্ষেত্রে আরও একটি বাড়তি চাপ থাকে-জনসম্মুখে ব্যক্তিগত জীবন। সাধারণ দম্পতির ঝগড়া বা দূরত্ব হয়তো ঘরের মধ্যেই থাকে। কিন্তু তারকার ক্ষেত্রে একটি ছবি, একটি পোস্ট কিংবা একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠানে না যাওয়াও হয়ে যায় আলোচনার বিষয়।

এতে করে সম্পর্কের বাস্তব সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক প্রত্যাশা-‘আদর্শ জুটি’ হিসেবে নিজেদের ধরে রাখার চাপ। তাহসান-মিথিলার বিচ্ছেদের সময়ও তারা জানিয়েছিলেন, সমাজ কী বলবে-এই ভয়ে শুধু অভিনয় করে সারাজীবন কাটিয়ে যেতে তারা রাজি ছিলেন না।

শুধু তারকারাই নয়, একই সংকট সাধারণ সংসারেও

এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এসে যায়। বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ শুধু তারকাদের সমস্যা নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জরিপে বিবাহবিচ্ছেদের কারণ হিসেবে সবচেয়ে বেশি এসেছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক—২৩ শতাংশ। এরপর দাম্পত্যজীবন বজায় রাখতে অক্ষমতা-২২ শতাংশ। এছাড়া, পরিবার চালাতে অক্ষমতা বা অনীহা, পারিবারিক চাপ, শারীরিক নির্যাতন ও যৌন অক্ষমতার মতো কারণও উঠে এসেছে।

অর্থাৎ তারকাদের বিচ্ছেদকে শুধু ‘খ্যাতির অভিশাপ’ হিসেবে দেখলে আসল চিত্রটি ধরা পড়ে না।

তাহলে তারকা হলেই কেন বিচ্ছেদ বেশি মনে হয়?

তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন আমাদের চোখের সামনে। আর একজন সাধারণ দম্পতির বিচ্ছেদের খবর হয়তো একটি পরিবার বা ছোট একটি মহল্লার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

কারণ, জনপ্রিয় দুই তারকা আলাদা হলেই সেটি সংবাদ হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, ভক্তদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়।

তাই আমাদের কাছে মনে হতে পারে, তারকাদের মধ্যে  বিচ্ছেদ বুঝি বেশি হয়।

সাফল্য কি সংসার বাঁচাতে পারে?

প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। অর্থ, জনপ্রিয়তা কিংবা সফল ক্যারিয়ার কি একটি সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা দিতে পারে? উত্তর হলো, না।

কারণ সংসারে প্রয়োজন যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান, প্রত্যাশার মিল, দায়িত্ব ভাগাভাগি এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।

আর সম্পর্ক যখন সেই জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে দুজনের জন্য আলাদা পথ বেছে নেওয়াই বেশি স্বস্তির, তখন বিচ্ছেদও কখনো কখনো দীর্ঘ সংঘাতের বদলে একটি সচেতন সিদ্ধান্ত হতে পারে।

প্রীতম–শেহতাজ অন্তত তাদের ঘোষণায় সেটিই বলেছেন- আলাদা পথে এগিয়ে যাওয়াই দুজনের জন্য ভালো।

সম্পর্কের আসল পরীক্ষা

তারকার জীবন বাইরে থেকে যতই ঝলমলে হোক, সম্পর্কের ভেতরের গল্পটা শেষ পর্যন্ত দুজন মানুষেরই।

সাফল্য, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্থ-কোনোটিই একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা নয়। কারণ সংসার টেকে শুধু ভালোবাসায় নয়; টেকে বোঝাপড়া, সম্মান, সময় আর একে অপরের পরিবর্তনকে মেনে নেওয়ার মানসিকতায়।

আর যখন সেই বোঝাপড়ার জায়গাটিই হারিয়ে যায়, তখন কখনো কখনো একসঙ্গে থাকার চেয়ে সম্মান নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়াই হয়ে ওঠে কঠিন, কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত।

প্রীতম–শেহতাজের গল্প তাই শুধু আরেকটি তারকা বিচ্ছেদের খবর নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়-সম্পর্কের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা একসঙ্গে শুরু করা নয়, সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েও একে অপরকে কতটা বুঝে চলা।    

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি