বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলে কোথায় ঘাটতি?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: বড় বড় সেতু, সড়ক আর অবকাঠামো নির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু যে শিক্ষা গড়ে তুলবে দক্ষ জনশক্তি, যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে সুস্থ কর্মক্ষম মানুষ-সেই দুই খাতেই বিনিয়োগ কি যথেষ্ট? বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, উন্নয়নের উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে রাজস্ব আহরণ ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগে পিছিয়ে বাংলাদেশ।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘স্মল গভর্নমেন্টস, বিগ অ্যাম্বিশনস: ফিসকাল পলিসি ইন ইস্ট এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোকেন্দ্রিক উন্নয়ন কৌশল দিয়ে ভবিষ্যতের উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনের তুলনায় কম বিনিয়োগ অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিকে কম অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলছে।

বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয়ের বড় বাধা দুর্বল রাজস্ব আহরণ। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ, জ্বালানি খাতের সমস্যা এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সংস্থাটির হিসাবে, প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার।

অর্থাৎ, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি থাকলে সরকারকে একদিকে নিয়মিত ব্যয়, ভর্তুকি ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয়, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পেও অর্থ বরাদ্দ দিতে হয়। এতে দীর্ঘমেয়াদে মানুষের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে-এমন খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি কমানো জরুরি। কর প্রশাসনকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা কর ছাড় পর্যালোচনা করতে হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমে করব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে রাজস্ব বাড়ানোর নামে নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো নির্মাণ করলেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা এবং সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা, প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক কিংবা বড় ভবন নয়; উন্নয়ন মানে শিক্ষিত, সুস্থ ও দক্ষ মানুষ। বাংলাদেশের উচ্চ আয়ের দেশের স্বপ্ন পূরণে তাই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। কারণ, অবকাঠামো উন্নয়নের পথ তৈরি করে, আর সেই পথে দেশকে এগিয়ে নেন মানুষ।  

 

—জা. অর্থনীতি/এলএটি