নারীদের এগ ফ্রিজিং কী, বাংলাদেশে কি এই সেবা আছে?
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

বয়স বাড়লে কি নারীদের সন্তান নেওয়ার ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে যায়? ক্যারিয়ার, পড়াশোনা কিংবা অসুস্থতার কারণে যারা এখনই মা হতে পারছেন না, তাদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এনেছে এক বৈপ্লবিক সমাধান। ডিম্বাণু জমিয়ে রেখে বহু বছর পর মা হওয়ার এই পদ্ধতির নাম এগ ফ্রিজিং। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে কাজ করে? আর বাংলাদেশে কি এই আধুনিক সেবা আদৌ পাওয়া যায়? খরচই বা কত?

এগ ফ্রিজিং বা ওসাইট ক্রায়োপ্রিজারভেশন এমন একটি চিকিৎসাপদ্ধতি, যেখানে একজন নারীর ডিম্বাশয় থেকে নিষিক্ত না হওয়া ডিম্বাণু সংগ্রহ করে অত্যন্ত কম তাপমাত্রায় হিমায়িত অবস্থায় দীর্ঘ সময়ের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে সন্তান নিতে চাইলে সংরক্ষিত সেই ডিম্বাণু ব্যবহার করে গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে এবং কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশেও এগ ফ্রিজিংয়ের সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

কিন্তু কেন নারীরা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন? মূলত ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ ধরে রাখার জন্যই এটি করা হয়। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের ডিম্বাণুর সংখ্যা ও গুণগত মান কমতে থাকে, ফলে পরবর্তীতে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনাও হ্রাস পায়। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোলজিস্টসের তথ্য অনুযায়ী, একজন নারী ১০ থেকে ২০ লাখ ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বয়ঃসন্ধিতে এটি কমে দাঁড়ায় ৩ থেকে ৫ লাখে, ৩৭ বছর বয়সে প্রায় ২৫ হাজারে এবং ৫১ বছর বয়সে মাত্র ১ হাজারের মতো ডিম্বাণু অবশিষ্ট থাকে।

চিকিৎসাজনিত কারণেও অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন। বিশেষ করে ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়ার আগে অনেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন, কারণ এসব চিকিৎসা প্রজননক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ডিম্বাশয়ে অস্ত্রোপচারের আগেও চিকিৎসকের পরামর্শে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এছাড়া চিকিৎসাজনিত সমস্যা না থাকলেও অনেকে ব্যক্তিগত কারণে এটি বেছে নেন, যাকে বলা হয় 'সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং'। যেমন-পড়াশোনা, ক্যারিয়ার বা উপযুক্ত সঙ্গী না পাওয়ার কারণে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিতে চাইলে কম বয়সে ভালো মানের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

যুক্তরাজ্যের এইচএফইএ-এর তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে নারীর ডিম্বাশয়ের অবস্থা জানা হয়। এরপর ওষুধের মাধ্যমে বেশি ও পরিপক্ব ডিম্বাণু তৈরি করা হয়। ডিম্বাণু প্রস্তুত হলে অ্যানেসথেশিয়া দিয়ে যোনিপথ দিয়ে একটি সরু সূচ প্রবেশ করিয়ে তা সংগ্রহ করা হয়।

সংগৃহীত ডিম্বাণুগুলো 'ভিট্রিফিকেশন' পদ্ধতিতে দ্রুত হিমায়িত করে তরল নাইট্রোজেনে মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখা হয়। পরবর্তীতে ডিম্বাণু বের করে শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত করার পর তৈরি হওয়া ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। হিমায়িত অবস্থা থেকে বের করার পর প্রতি ১০টি ডিম্বাণুর মধ্যে ৮ থেকে ৯টি টিকে থাকার আশা করা যায়। অনেকে ডিম্বাণুর বদলে সরাসরি ভ্রূণও ফ্রিজ করে রাখেন, যাকে এমব্রিও ফ্রিজিং বলা হয়।

বাংলাদেশে ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, দেশে এখনও সোশ্যাল এগ ফ্রিজিং তেমন জনপ্রিয় হয়নি। মূলত ক্যান্সার রোগীরাই ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন।

খরচের দিক থেকে, ডিম্বাণু সংগ্রহ করা পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর ডিম্বাণু ফ্রিজ করার জন্য এককালীন ৫৫ হাজার টাকা এবং প্রতি বছর সংরক্ষণ ফি হিসেবে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে।

ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই যে সন্তান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ৩৫ বছরের কম বয়সে ১২টি ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ, আর ২০টি ডিম্বাণু থাকলে তা বেড়ে ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

ঝুঁকির ক্ষেত্রে, ডিম্বাণু পরিপক্ব করার হরমোন ইনজেকশনের কারণে ওভারিয়ান হাইপারস্টিমুলেশন সিনড্রোম বা ওএইচএসএস হতে পারে। এছাড়া ডিম্বাণু সংগ্রহের সময় সামান্য সংক্রমণ বা রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে। ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে এগ ফ্রিজিংয়ের প্রক্রিয়ায় আড়াই সপ্তাহ সময় লাগায় কেমোথেরাপি শুরু হতে কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে সব মিলিয়ে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি একটি নিরাপদ পদ্ধতি।

ক্যারিয়ারের কারণে সন্তান নেওয়া পিছাচ্ছেন?

পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার গুছাতে গিয়ে সন্তান নেওয়ার বয়স পার হয়ে যাচ্ছে? দুশ্চিন্তার দিন শেষ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এনেছে এগ ফ্রিজিং। কম বয়সে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে রাখলে পরবর্তীতে যেকোনো বয়সে মা হওয়া সম্ভব। বয়স বাড়লে ডিম্বাণুর মান কমে যায়, কিন্তু আগে থেকে ফ্রিজ করে রাখলে সেই ঝুঁকি থাকে না। বাংলাদেশেও এখন এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। ক্যারিয়ার ও পরিবার-দুটোই এখন হাতের মুঠোয়!

ক্যান্সারের চিকিৎসাতেও কমবে না প্রজননক্ষমতা!

কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির প্রভাবে নারীদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু চিকিৎসার আগেই যদি এগ ফ্রিজিং বা ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা যায়, তবে ক্যান্সার জয়ের পরও মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ সম্ভব! চিকিৎসাজনিত এই ডিম্বাণু সংরক্ষণ সেবা এখন বাংলাদেশেই সহজলভ্য। সচেতন হোন, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে সুরক্ষিত রাখুন।

—জা. অর্থনীতি/এলএটি