জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
কানাডায় গিয়ে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন কি এখন প্রবাসীদের জন্য কঠিনতম বাস্তবে রূপ নিয়েছে? একসময়ের স্বপ্নের দেশ কানাডায় গিয়ে আজ চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন লাখ লাখ প্রবাসী এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী। কিন্তু কেন হঠাৎ এই সংকট?
মহামারী পরবর্তী সময়ে দেশের তীব্র শ্রম সংকট সামাল দেওয়া আর অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কানাডা সরকার বিদেশি কর্মী এবং শিক্ষার্থী গ্রহণে নজিরবিহীন ছাড় দিয়েছিল। ভেবেছিলেন সহজে স্থায়ী হওয়া যাবে? ঠিক সেখানেই ঘটেছে বিপত্তি। দীর্ঘমেয়াদি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব, ভয়াবহ আবাসন সংকট এবং সামাজিক সেবাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পুরো দেশকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় অভিবাসন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কানাডার ইমিগ্রেশন, রিফ্যুজি অ্যান্ড সিটিজেনশিপ বিভাগ বা আইআরসিসি ইমিগ্রেশন নীতিতে একের পর এক কঠোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই-দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে 'অস্থায়ী বাসিন্দা' বা টেম্পোরারি রেসিডেন্টদের অনুপাত একটি টেকসই স্তরে কমিয়ে আনা।
অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে দেশটির বড় বড় শহরগুলোতে বাসা ভাড়া এবং আবাসন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে তীব্র জট। এই অবস্থা সামাল দিতে সরকার প্রতি বছর স্থায়ী আবাসন বা পিআর দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এনেছে। একই সাথে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মী আসা প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এই নীতিগত রদবদলের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী এখন সেখানে অবস্থানরত বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা, যার মধ্যে একটি বড় অংশই বাংলাদেশি। বহু শিক্ষার্থীর পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়ে আসছে, অথচ তারা পারমিট নবায়ন করতে পারছেন না, পাচ্ছেন না স্থায়ী বসবাসের সুনির্দিষ্ট পথও।
সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়েছে স্পাউসাল ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের নতুন নিয়মে। এখন থেকে ঢালাওভাবে আর শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনসঙ্গীদের কাজের অনুমতি পারমিট এনে দিতে পারবেন না। শুধু স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ বা প্রযুক্তির মতো নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত খাতের শিক্ষার্থী এবং মাস্টার্স ও পিএইচডি গবেষকদের স্পাউসরা এই কাজের অনুমোদন পাবেন। ফলে হাজার হাজার প্রবাসী পরিবার আইনি জটিলতায় পড়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
কানাডায় থাকা দক্ষিণ এশীয় প্রবাসীদের অনেকেই এখন একটি বৈধ ওয়ার্ক পারমিট বা এলএমআইএ-এর জন্য মরিয়া হয়ে ছুটছেন। তবে সেই পথও আর সহজ নেই। জালিয়াতি বন্ধ করতে সরকার এসব প্রক্রিয়ায় কড়া তদারকি শুরু করেছে।
তবে সব দরজাই কি একবারে বন্ধ? উত্তর হলো, না। কানাডা সরকার এখন ঢালাও অভিবাসনের পরিবর্তে খাতভিত্তিক ও দক্ষ অভিবাসীদের বেছে নিচ্ছে। যাদের স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, বা নির্মাণ খাতে কাজের দক্ষতা আছে, কিংবা যারা ফরাসি ভাষায় দক্ষ, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ এখনও খোলা রয়েছে। সরকারের এই নতুন নীতির কারণে একদিকে যেমন নিজেদের অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফেরানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে স্বপ্নের দেশ কানাডায় প্রবাসীদের মধ্যে জেঁকে বসেছে চরম অনিশ্চয়তা।
কানাডায় বাংলাদেশিদের জন্য বড় সতর্কবার্তা
সব পথ কি বন্ধ হয়ে গেল কানাডায়? না, বদলে গেছে নিয়ম। সরকার এখন ঢালাও ইমিগ্রেশন বন্ধ করে শুধু নির্দিষ্ট কিছু খাতের দক্ষ মানুষদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আপনার যদি হেলথকেয়ার, টেকনোলজি বা কনস্ট্রাকশন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা থাকে, কিংবা আপনি যদি ফ্রেঞ্চ ভাষায় দক্ষ হন, তবে এখনও এক্সপ্রেস এন্ট্রির দরজা আপনার জন্য খোলা। পরিবর্তন মেনে নিজেকে দক্ষ করে তোলাই এখন কানাডায় টিকে থাকার প্রধান শর্ত।
ইমিগ্রেশনে কঠোর কানাডা, বাংলাদেশিদের জন্য কোন পথ খোলা?
কানাডায় পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিট শেষ? স্পাউস ওয়ার্ক পারমিটেও কড়াকড়ি। আবাসন সংকট ও জনসংখ্যার চাপ সামলাতে শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের প্রবেশ প্রায় অর্ধেকে নামিয়ে আনছে কানাডা সরকার। এখন আর আগের মতো সহজেই স্থায়ী আবাসন বা পিআর পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জেনে-বুঝে প্রস্তুতি না নিয়ে কেবল গুজবে কান দিয়ে বর্তমানে কানাডা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বড় ভুল।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি