খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধাক্কার আশঙ্কা, সংকটে পড়তে পারে কোটি মানুষ (ভিডিও)
ছবি: জাতীয় অর্থনীতি

জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:

 

জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক সংঘাত আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের চাপে বাড়ছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে বছরের শেষ নাগাদ পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইপিসি। সংস্থাটির আশঙ্কা, তীব্র খাদ্য সংকটে এক কোটি ৮১ লাখ মানুষ।

চলতি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে জাতিসংঘের বৈশ্বিক ক্ষুধা পর্যবেক্ষণ সংস্থা দ্য ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্ল্যাসিফিকেশন (আইপিসি)। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ বা ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন। তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে দেশের তিন জেলা– কক্সবাজার, বান্দরবান ও সুনামগঞ্জ।

চলতি বছরের জুনে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ: মে-ডিসেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তার পাঁচটি পর্যায় তুলে ধরেছে আইপিসি । এতে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ৪ কোটি ২৮ লাখ ২৯ হাজার মানুষ পর্যাপ্ত খাদ্য পান। দ্বিতীয় পর্যায়ে খাদ্য জোগাড়ে চাপে রয়েছেন ৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৯ হাজার মানুষ। তৃতীয় পর্যায়ে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪৮ হাজার মানুষ এবং চতুর্থ পর্যায়ে জরুরি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষের। পঞ্চম বা দুর্ভিক্ষ পর্যায়ে বর্তমানে কেউ নেই।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, খাদ্যশস্যের উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবিক সহায়তায় অর্থের সংকট খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আইপিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি ও নোয়াখালীর পরিস্থিতি চাপের পর্যায় থেকে সংকটের পর্যায়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, কক্সবাজার, ভাসানচর, বান্দরবান ও সুনামগঞ্জে তীব্র খাদ্যসংকটের ঝুঁকি বেশি। এসব এলাকার প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ সংকটে পড়তে পারেন। কক্সবাজার ও ভাসানচরের রোহিঙ্গাদের ১০ শতাংশ এবং বান্দরবান ও সুনামগঞ্জের ৫ শতাংশ মানুষের পরিস্থিতি জরুরি পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

খাদ্যসহায়তায় অর্থের ঘাটতি, সাম্প্রতিক বন্যা, জীবিকার সীমিত সুযোগ ও অনানুষ্ঠানিক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা এ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম ও রাঙামাটিতে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং দেশের অন্যান্য জেলায় ১০ থেকে ২৫ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গারা ন্যূনতম খাদ্যচাহিদা পূরণে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বছরের শেষ দিকে সহায়তা ব্যাহত হলে খাদ্যসংকট আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি জীবিকার সুযোগ কমে যাওয়া, সীমান্তের অস্থিতিশীলতা, ঘূর্ণিঝড় ও আকস্মিক বন্যা তাদের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে।

খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ার পেছনে আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং খাদ্যসহায়তায় অর্থের ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইউক্রেন, ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, সার ও কৃষিপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন ব্যাহত হলে কৃষি উপকরণের ব্যয় বাড়তে পারে, যা উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের দামে প্রভাব ফেলবে। এ ছাড়া বঙ্গোপসাগরে তিন থেকে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি এবং কোনো কোনোটি ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বৃষ্টিপাতের ঘাটতি ও হাওড়াঞ্চলে বন্যার প্রভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।

এদিকে, চলতি বছর জীবনরক্ষাকারী খাদ্যসহায়তায় ১ কোটি ৭৫ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এতে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের খাদ্যসহায়তা ও জীবিকা কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের বিশেষ সহায়তা এবং কৃষি উপকরণে ভর্তুকি দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘দেশে ব্যবহৃত মোট ডিজেলের প্রায় ২৪ শতাংশ কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয়। সেচ ও কৃষি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এবং খাদ্য উতৎপাদন কমে যাওয়া ঠেকাতে সেচ কাজে ব্যবহৃত ডিজেলের ওপর বিশেষ অর্থ বা ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষকদের সরাসরি ডিজেল ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হলে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে।’

সব মিলিয়ে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও আন্তর্জাতিক অস্থিরতার সম্মিলিত প্রভাবে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে কৃষি উৎপাদন সচল রাখা, খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল করা এবং সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।  

—জা. অর্থনীতি/এলএটি