জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক:
বছরে খরচ ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার! কেনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। তবুও রেহাই পাচ্ছে না সৌদি আরব! ইয়েমেনের হুতিদের একটা সাধারণ মিসাইল বা ড্রোন এসে তছনছ করে দিচ্ছে তেল শোধনাগার থেকে শুরু করে বিমানবন্দর। কিন্তু কীভাবে, কোটি কোটি ডলারের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাঁকি দিচ্ছে হুতিরা?
রণক্ষেত্রে হুতিদের এমন সাফল্যের পেছনে কী আছে? এর রহস্য লুকিয়ে রয়েছে তাদের নতুন আর ভয়ংকর এক সামরিক কৌশলে-প্রথমে নেটওয়ার্ক জ্যাম, তারপর ঝটিকা হামলা! সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, লোহিত সাগর আর মধ্যপ্রাচ্যে হুতি বিদ্রোহীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। তবে, তাদের বড় অস্ত্র এখন শুধু মিসাইল নয়, বরং তাদের 'ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কৌশল'।
হামলার একদম শুরুতে হুতিরা উন্নত জ্যামার ব্যবহার করে সৌদির আধুনিক রেডার, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম আর যোগাযোগ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অচল বা 'জ্যাম' করে দেয়। এর ফলে, সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সাময়িকভাবে অন্ধ হয়ে পড়ে। আর ঠিক তখনই, সেই ফাঁক গলে আকাশে ওড়ে হুতিদের দূরপাল্লার সুইসাইড ড্রোন ও ব্যালাস্টিক মিসাইল! রেডার আগেই নিভে যাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বিশ্বখ্যাত ‘প্যাট্রিয়ট’ মিসাইল সিস্টেমও টের পাওয়ার আগেই আঘাত হেনে বসে হুতিদের ড্রোন!
এদিকে, গত বছর প্রতিরক্ষায় ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে সৌদি আরব। কিন্তু সিএনএনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মূল সমস্যা লুকিয়ে আছে সৌদির বিশাল ভূখণ্ড আর তিন দিক থেকে আসা হুমকির মধ্যে!
পূর্বে ইরান, উত্তরে ইরাকের ইরানসমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী, আর দক্ষিণে ইয়েমেনের হুতি! এত বড় দেশের হাজার হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত তেল শোধনাগার, পাইপলাইন আর বিমানবন্দর রক্ষা করার মতো এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম একসঙ্গে সব জায়গায় বসানো অসম্ভব!
তার ওপর হুতিরা ব্যবহার করছে নিচ দিয়ে উড়ে যাওয়া ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র! সাধারণ রেডারে নিচ দিয়ে উড়ে আসা এসব ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব! ফলে, বহু হামলা ঠেকানো গেলেও, গুরুত্বপূর্ণ অনেক লক্ষ্যবস্তুতে ঠিকই আঘাত হানছে ইয়েমেনের বিদ্রোহীরা।
অন্যদিকে, প্রশ্ন উঠছে, এত প্রযুক্তি হুতিরা পাচ্ছে কোথায়? জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা আগেই ইয়েমেনে ইরানি অস্ত্রের প্রমাণ পেয়েছিলেন। হুতিদের নতুন ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নকশার সঙ্গেও ইরানি অস্ত্রের হুবহু মিল রয়েছে। তবে, তেহরানের মিত্র হলেও হুতিদের নিজস্ব লক্ষ্য পরিষ্কার। দীর্ঘ যুদ্ধের পরও তাদের ওপর চলা অর্থনৈতিক অবরোধের জবাবে তারা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি খুব স্পষ্ট-ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সহায়তায় সৌদি বিমান হামলা বন্ধ করতে হবে এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
সম্প্রতি ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিলে এবং রিয়াদ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলেও হুতিরা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে! এমনকি এখন রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার আগে দেওয়া প্রচলিত ফোন সতর্কতাও বন্ধ করে দিয়েছে তারা!
বিশ্লেষকরা বলছেন, কেবল আকাশপথ বা স্থল অভিযান চালিয়ে হুতিদের পুরোপুরি দমন করা প্রায় অসম্ভব! গত বছর যুক্তরাষ্ট্র নিজেই সাত সপ্তাহের অভিযানে ১০০ কোটি ডলারের বেশি খরচ করেও হুতিদের এক চুল সরাতে পারেনি! উল্টো হুতিরা এখন সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন ‘তাইজ’ শহর ঘিরে ফেলেছে।
উপায় না দেখে সৌদি আরব এখন পাকিস্তান ও মিসরের মতো দেশগুলোকে পাশে নিয়ে আন্তর্জাতিক জোট গড়ার চেষ্টা করছে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রও এখন দেখে-শুনে পা ফেলছে। সব মিলিয়ে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতদের মতে, কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধাস্ত্র দিয়েও যেখানে সমাধান আসছে না, সেখানে শেষ পর্যন্ত কূটনীতির টেবিলেই ফিরতে হবে রিয়াদকে।
হু/তিদের কোন কৌশলে সৌদি আরব যাঁতাকলে?
৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনেও কেন অরক্ষিত সৌদি আরব? রহস্যটা লুকিয়ে আছে ইয়েমেনের হুতিদের নতুন এক কৌশলে! হুতিরা এখন আর সরাসরি মিসাইল মারে না। প্রথমে তারা অ্যাডভান্সড জ্যামার দিয়ে সৌদির কোটি কোটি ডলারের রেডার আর ডিফেন্স নেটওয়ার্ক পুরোপুরি 'ব্ল্যাকআউট' বা জ্যাম করে দেয়! আর রেডার অন্ধ হতেই নিচু দিয়ে উড়ে এসে আঘাত হানে মারাত্মক ড্রোন ও ক্রুজ মিসাইল!
পূর্বে ইরান, উত্তরে ইরাক আর দক্ষিণে হুতি-তিন দিকের এই ভয়ংকর ফাঁদ কাটাতে এখন দিশেহারা রিয়াদ!
—জা. অর্থনীতি/এলএটি