ড. মো. আদনান আরিফ সালিম
সৌদি আরবে সম্প্রতি যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, তাঁদের কারও মাতৃভাষা আরবি নয়। অথচ যে দেশে তাঁদের বিচার হয়েছে, সেই দেশের ভাষা ও বিচারব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাঁদের কতটুকু ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় যথাযথ আইনি সহায়তা নিশ্চিত হয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো আমাদের সামনে নেই। তাঁদের পক্ষে কোনো বাংলাদেশি আইনজীবী কার্যকরভাবে আইনি লড়াই করতে পেরেছিলেন কি না, কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্র তাঁদের অধিকার রক্ষায় কী ভূমিকা পালন করেছিল, সেটিও স্পষ্ট নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের পরিসংখ্যান ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দণ্ডিত ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ বিদেশি নাগরিক এবং তাঁদের অনেকে অভিবাসী শ্রমিক। তাঁদের অনেকেই সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির মানুষ। তাহলে কি সৌদি আরব এমন এক নিখুঁত সমাজে পরিণত হয়েছে, যেখানে সব ধরনের অপরাধ ও অনাচারের দায় এসে পড়ে দরিদ্র, অসহায় ও অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর? নাকি তাঁদের দুর্বল সামাজিক অবস্থান, সীমিত আইনি সহায়তা এবং নিজ দেশের রাষ্ট্রের কার্যকর সুরক্ষার অভাব তাঁদের আরও বেশি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
সৌদি আরবের নাম শুনেই যাঁরা আবেগে আপ্লুত হয়ে ওঠেন, কিংবা দেশটির বিচারব্যবস্থার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীতভাবে সমর্থন করতে চান, তাঁদের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, বিষয়টি একটু গভীরভাবে বিবেচনা করুন। আপনার পরিবারের কোনো সদস্য যদি বিদেশের মাটিতে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতেন, যদি তাঁর ভাষা বোঝার মতো কেউ পাশে না থাকত, আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার মতো কেউ এগিয়ে না আসত, আর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে নিজের দেশের রাষ্ট্রও যদি তাঁকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হতো, তাহলে আপনার প্রতিক্রিয়া কী হতো? তখনও কি আপনি বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিতেন?
সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা, মৃত্যুদণ্ড এবং বিদেশি নাগরিকদের অসহায়তা নিয়ে ভাবতে গিয়ে দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের একটি কাহিনি মনে পড়ে। রবি তেজা অভিনীত তেলুগু চলচ্চিত্র খড়গম নয়, বরং সৌদি আরবের প্রেক্ষাপটে নির্মিত যে চলচ্চিত্রটির কথা এখানে বলা হচ্ছে, তার নাম ও কাহিনির বিবরণ নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কাহিনিটির বর্ণনা অনুযায়ী, একজন সৌদি শেখ এক ভারতীয় নারীকে ধর্ষণ করেন। অথচ বিচারের পরিণতিতে এমন একজন ভারতীয় নাগরিক মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হন, যিনি প্রকৃত অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে আসা একজন আইনি লড়াইয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তি তাঁর পক্ষে দাঁড়ান এবং যথাযথ আইনি প্রচেষ্টার মাধ্যমে তাঁকে মুক্ত করার পথ তৈরি করেন।
এই চলচ্চিত্রের কাহিনি বাস্তব ঘটনার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নয়। তবে এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: বিদেশের মাটিতে কোনো ব্যক্তি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেই কি ধরে নিতে হবে যে তিনি অপরাধী? অভিযোগ, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং ন্যায়সংগত বিচার, প্রতিটি বিষয়ই কি সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়?
মক্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির প্রকৃত অপরাধ, তাঁদের বিরুদ্ধে উপস্থাপিত প্রমাণ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই না করে তাঁদের নির্দোষ ঘোষণা করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে বলেই তাঁদের অপরাধী ধরে নেওয়াও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী।
তাই আবেগ নয়, অন্ধ আনুগত্যও নয়; প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারের দাবি। মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির ক্ষেত্রে এই দাবি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল বিচারের মাশুল এখানে শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, একটি মানুষের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া জীবন।
সৌদি আরবের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই শ্রদ্ধা যেন ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কেড়ে না নেয়। অন্য দেশের বিচারব্যবস্থাকে সম্মান করার অর্থ তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং প্রকৃত ন্যায়বিচারের স্বার্থেই জানতে হবে, এই দুই বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ছিল, তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কতটা নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব বাংলাদেশের রাষ্ট্র যথাযথভাবে পালন করেছিল কি না।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাততালি দেওয়ার আগে তাই আরেকবার ভাবুন। প্রশ্নটি শুধু তাঁরা অপরাধী ছিলেন কি না, তা নয়। প্রশ্নটি হলো, তাঁদের অপরাধ প্রমাণের জন্য ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত হয়েছিল কি না এবং তাঁদের জীবন রক্ষার জন্য যা যা করা সম্ভব ছিল, তার সবকিছু করা হয়েছিল কি না।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়