বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে

উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেও জনভোগান্তি কমানো না গেলে সেই উন্নয়ন পরিকল্পনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। বিমানবন্দর-গাজীপুর বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প তারই একটি বড় উদাহরণ। যানজট নিরসন, যাতায়াতের সময় কমানো এবং নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে গতিশীল করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ১৪ বছরেও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দীর্ঘ নির্মাণকাজের কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে, অপচয় হয়েছে কর্মঘণ্টার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। এখন প্রকল্পটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

২০১২ সালে প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় তৃতীয় সংশোধনীতে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। পরে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি। যে প্রকল্প নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ে জনসাধারণকে উন্নত পরিবহনসেবা দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রত্যাশিত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলার প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ৭০ কোটি টাকা। জনগণের করের টাকায় নির্মিত অবকাঠামো এভাবে পরিত্যক্ত হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি ছিল বাস্তবতার সঙ্গে পরিকল্পনার অসঙ্গতি। বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় চারলেনের সড়কে আলাদা বিআরটি লেনের উপযোগিতা, উড়ালসড়ক ও সমতল সড়কের সমন্বয়ে বাসের গতি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এবং স্টেশনের কারণে মূল সড়ক সংকুচিত হয়ে যাওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছে। অনেক জায়গায় ফুটপাতের জায়গাও সংকুচিত হয়েছে, ব্যাহত হয়েছে স্বাভাবিক যান চলাচল। 

প্রকল্প বাস্তবায়নে একাধিক সংস্থার সম্পৃক্ততা এবং সমন্বয়হীনতাও পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালনা ও তদারকিতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। এতগুলো সংস্থা থাকার পরও যদি সময়মতো কাজ শেষ না হয়, নকশাগত দুর্বলতা সংশোধন করা না যায় এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব না হয়, তাহলে দায়িত্ব ও জবাবদিহির কাঠামো নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। কোনো প্রকল্পে একাধিক সংস্থা কাজ করতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত দায়িত্ব কার, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কোথায় এবং ব্যর্থতার দায় কে নেবে— তা শুরুতেই স্পষ্ট থাকতে হবে।

বর্তমানে প্রকল্পের স্টেশন ও লেন ডিভাইডার অপসারণ করে সড়ককে ছয়লেনে রূপান্তরের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার পেছনে জনস্বার্থের যুক্তি রয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামোর যেগুলো কার্যকর, সেগুলো ব্যবহার করে সড়কের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে তা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হবে। তবে স্টেশন ভেঙে ফেললেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সড়ক প্রশস্ত করার পাশাপাশি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বাস চলাচলের শৃঙ্খলা, ফুটপাত পুনরুদ্ধার, নিরাপদ পারাপার এবং গণপরিবহনের কার্যকর পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় একটি ব্যর্থ প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে আরেকটি অপরিকল্পিত সড়কব্যবস্থা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে। সরকারের উচিত বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন মতামত পর্যালোচনা করে স্বচ্ছ কারিগরি মূল্যায়নের ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া। কোনো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে রাজনৈতিক অবস্থান বা প্রশাসনিক সুবিধার চেয়ে জনস্বার্থ, দীর্ঘমেয়াদি পরিবহন পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিআরটি প্রকল্পের ব্যর্থতার দায় নির্ধারণ। ভুল পরিকল্পনা, দুর্বল নকশা, সমন্বয়হীনতা কিংবা তদারকির ঘাটতির জন্য কারা দায়ী, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। শুধু প্রকল্প বাতিল বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। সরকারি অর্থের অপচয় এবং জনদুর্ভোগের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়ন, ব্যয়-সুফল বিশ্লেষণ, বাস্তবসম্মত সময়সীমা এবং নিয়মিত অগ্রগতি পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, অর্থনীতির কতটা উপকার হলো এবং বিনিয়োগের বিপরীতে কতটা সুফল পাওয়া গেল তার ওপর। উন্নয়ন প্রকল্পে পরিকল্পনার যথার্থতা, দক্ষ বাস্তবায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে বিআরটির মতো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। জনগণের অর্থের সুরক্ষা এবং জনস্বার্থ নিশ্চিত করাই হতে হবে উন্নয়ন পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।