ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার: ১৯৫০-এর দশকে ভ্যাকুয়াম টিউবের জায়গায় ট্রানজিস্টর ও ১৯৭০-এর দশকে মাইক্রোপ্রসেসরের (সিলিকন চিপ) আবিষ্কার কম্পিউটারের জগৎ বদলে দেয়। এক সময়ের ঘরের সমান বড় কম্পিউটার চোখের পলকে হাতের মুঠোয় চলে আসে। আজ একটি সাধারণ ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন প্রতি সেকেন্ডে শত কোটি (Gigahertz) হিসাব করতে পারে। আর বিশ্বের আধুনিক সুপার কম্পিউটারগুলোর গতি এখন এক্সাফ্লপ্স (Exaflops) স্তরে পৌঁছেছে, যা প্রতি সেকেন্ডে ১০ লাখ কোটি কোটির (১ এর পর ১৮টি শূন্য) চেয়েও বেশি গণনা করতে সক্ষম (কোয়ান্টাম কম্পিউটার)। এগুলো একসঙ্গে হাজার হাজার প্রসেসর যুক্ত হয়ে (Parallel Processing) বিশাল ডেটা মুহূর্তের মধ্যে প্রসেস করে। এর ফলেই আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটা অ্যানালিটিকস ও জটিল আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সিলিকন চিপ-নির্ভর এসব কম্পিউটারের সাফল্যের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে বায়ো-কম্পিউটার, যা জীবন্ত কোষ, ডিএনএ, প্রোটিন বা মানব মস্তিষ্কের নিউরনের মতো জৈব উপাদান ব্যবহার করে তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে। সাধারণত ত্বকের কোষ ও নিউরন সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের কোষ হলেও বিজ্ঞানীরা কোষের জিনগত বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করে ত্বকের কোষকে আবার এমন অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন, যেখান থেকে তা নিউরনে রূপান্তরিত হতে পারে। এ পুনঃপ্রোগ্রামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে বৈদ্যুতিক সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। এমন কয়েক হাজার নিউরনকে বিশেষ পরিবেশে একত্রিত করলে গড়ে উঠতে পারে ক্ষুদ্র ত্রিমাত্রিক কোষগুচ্ছ, যাকে বলা হয় ‘ব্রেইন অর্গানয়েড’। এটি পূর্ণাঙ্গ মানবমস্তিষ্ক নয়, বরং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য অনুকরণকারী একটি ক্ষুদ্র জৈবিক মডেল বা ‘নিউরাল টিস্যু মডেল’। বিজ্ঞানীরা নিউরনের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য গ্রহণ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ করে তার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করেছেন/পেয়েছেন যা আলঝেইমার, পারকিনসন, মৃগীসহ বিভিন্ন স্নায়বিক রোগের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে রোগীর কোষ থেকে নিউরন বা অর্গানয়েড তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে ব্যক্তিভেদে রোগের বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য চিকিৎসার কার্যকারিতা অনেক সহজতর হবে বলে তারা মনে করছেন।
ব্রেইন অর্গানয়েডের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনা হচ্ছে এর সঙ্গে ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক হার্ডওয়্যার যুক্ত করা যায়। প্রচলিত সিলিকন চিপে ট্রানজিস্টর বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে। অন্যদিকে নিউরনও বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান করে। এ মিলকে কাজে লাগিয়ে গবেষকরা নিউরন ও ইলেকট্রনিক সার্কিটের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন। ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড বা সেন্সরের মাধ্যমে নিউরনের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ শনাক্ত করা যায় এবং কম্পিউটার সেই সংকেতকে ডিজিটাল তথ্য হিসেবে বিশ্লেষণ করতে পারে। আবার ইলেকট্রনিক সিস্টেম থেকে নির্দিষ্ট সংকেত নিউরাল টিস্যুতেও পাঠানো সম্ভব। এভাবে জৈবিক নিউরন ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মধ্যে দ্বিমুখী যোগাযোগ তৈরি করা যায়। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করেই ‘বায়োলজিক্যাল কমপিউটিং’ বা ‘বায়ো-কম্পিউটিং’-এর বিকাশ ঘটছে। এর লক্ষ্য প্রচলিত কম্পিউটারকে সরাসরি মানুষের মস্তিষ্ক দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়, বরং জীবন্ত কোষের স্বাভাবিক তথ্য-প্রক্রিয়াকরণ ক্ষমতাকে কমপিউটেশনাল কাজে ব্যবহার করা। নিউরনের বিশাল সংখ্যক সংযোগ, অভিযোজন ক্ষমতা ও শেখার বৈশিষ্ট্য প্রচলিত কমপিউটিংয়ের জন্য আকর্ষণীয়। বিশেষ করে কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ধারণার সঙ্গে জৈবিক নিউরনের কিছু কার্যপ্রক্রিয়ার মিল রয়েছে। ভবিষ্যতে এমন ব্যবস্থা তৈরি হতে পারে যেখানে একটি ইলেকট্রনিক কম্পিউটার নির্দিষ্ট ইনপুট দেবে, নিউরনগুলো তাদের নিজস্ব বৈদ্যুতিক কার্যকলাপের মাধ্যমে সেটি প্রক্রিয়াকরণ করবে ও আবার ইলেকট্রনিক সিস্টেম সেই ফলাফল সংগ্রহ করবে। গবেষণাগারে নিউরনকে প্রশিক্ষিত করে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন শনাক্ত করার মতো কাজ করার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। তবে এটি এখনও প্রাথমিক গবেষণা পর্যায়ে থাকা একটি প্রযুক্তি, যার বাস্তব প্রয়োগ, নির্ভরযোগ্যতা, দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব এবং বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে আরও বিস্তর গবেষণা প্রয়োজন।
জীবন্ত নিউরন দিয়ে কম্পিউটার বা বায়োলজিক্যাল কম্পিউটিংয়ের অন্যতম বড় সম্ভাবনা হলো শক্তি-সাশ্রয়ী ও অভিযোজনক্ষম তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ। মানবমস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল কাজ সম্পাদন করলেও তার শক্তি ব্যবহারের পরিমাণ আধুনিক বৃহৎ কম্পিউটিং অবকাঠামোর তুলনায় অত্যন্ত কম। তবু নিউরনের স্বাভাবিক সংযোগ, সমান্তরাল সংকেত প্রক্রিয়াকরণ ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সংযোগ পরিবর্তনের ক্ষমতা ভবিষ্যতের কম্পিউটিং প্রযুক্তির জন্য নতুন ধারণা দিতে পারে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় যেখানে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের জন্য প্রচুর কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন, সেখানে জৈবিক নিউরাল সিস্টেম নতুন ধরনের ‘অ্যাডাপটিভ কম্পিউটিং’ তৈরির অনুপ্রেরণা দিতে পারে। গবেষণার পাশাপাশি এই প্রযুক্তি ওষুধ আবিষ্কারেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষীয় বৈশিষ্ট্য অর্গানয়েডে আংশিকভাবে পুনর্গঠন করা গেলে নতুন ওষুধ কোনো স্নায়বিক রোগের ওপর কী প্রভাব ফেলে তা পরীক্ষা করার জন্য উন্নত মডেল পাওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে ব্যক্তিগত চিকিৎসার ক্ষেত্রেও রোগীর নিজস্ব কোষ ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক মডেল তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ প্রযুক্তির সামনে বড় চ্যালেঞ্জও আছে। অর্গানয়েডের আকার সীমিত, এর কোষগুলো সব সময় একইভাবে আচরণ করে না এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল কার্যক্ষমতা বজায় রাখা কঠিন। ইলেকট্রনিক হার্ডওয়্যারের সঙ্গে জীবন্ত টিস্যুর নিরাপদ ও দীর্ঘস্থায়ী সংযোগও একটি বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা। উপরন্তু জৈবিক উপাদানকে কমপিউটিংয়ের কাজে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে উৎপাদন, সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও পরীক্ষার পদ্ধতি এখনও পুরোপুরি মানসম্মত হয়নি। তাই প্রযুক্তিটির সম্ভাবনা বিশাল হলেও গবেষণার এই পর্যায়ে এর সক্ষমতা এবং তথ্যপ্রক্রিয়াকরণে আগাম বার্তা নিরূপণ করা সময়সাপেক্ষ।
ভবিষ্যতে এ ধরনের নিউরনভিত্তিক কম্পিউটার কি প্রচলিত সিলিকনভিত্তিক কম্পিউটারকে প্রতিস্থাপন করবে? ধারণা করা হচ্ছে, দুই প্রযুক্তিই পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। সিলিকন চিপ দ্রুত ও নির্ভুল গাণিতিক হিসাব করতে অত্যন্ত কার্যকর, আর জৈবিক নিউরাল সিস্টেম জটিল প্যাটার্ন, অভিযোজন ও শেখার মতো ক্ষেত্রে নতুন ধরনের সুবিধা দিতে পারে। ফলে ভবিষ্যতের কম্পিউটার হয়তো সম্পূর্ণ জৈবিক কিংবা সম্পূর্ণ সিলিকনভিত্তিক না হয়ে ‘হাইব্রিড’ হতে পারে, যেখানে ইলেকট্রনিক প্রসেসর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং জীবন্ত নিউরাল টিস্যু একসঙ্গে কাজ করবে। তবে এখানে নৈতিক প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্গানয়েড যত উন্নত হবে, ততই প্রশ্ন উঠবে, কোন পর্যায়ের নিউরাল কার্যকলাপকে চেতনা বা অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত করা/বলা যায়? যদিও এখন পর্যন্ত গবেষণাগারে ব্যবহৃত ব্রেইন অর্গানয়েডকে মানুষের মতো সচেতন সত্তা হিসেবে বিবেচনা করার তেমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হয়নি। তবু ভবিষ্যতে অর্গানয়েডের জটিলতা বাড়লে প্রাণী-গবেষণা, কোষের ব্যবহার, সম্মতি, তথ্যের মালিকানা এবং সম্ভাব্য নৈতিক মর্যাদা নিয়ে নতুন নীতিমালা প্রয়োজন হতে পারে। তাই মানব ত্বকের কোষ থেকে নিউরন তৈরি, সেই নিউরন দিয়ে ব্রেইন অর্গানয়েড গঠন ও ক্ষুদ্র ইলেকট্রনিক হার্ডওয়্যারের সঙ্গে তার সংযোগ স্থাপন ইত্যাদি শুধু নতুন ধরনের কম্পিউটার তৈরির প্রযুক্তি নয়, বরং এটি হবে জীববিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশলের মিলনস্থল।
উল্লেখ্য, নিউরনভিত্তিক কম্পিউটার (বায়ো-কম্পিউটার) ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকভাবে বাজারে চলে এসেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে অস্ট্রেলিয়ান স্টার্টআপ কোম্পানি ‘কর্টিক্যাল ল্যাবস’ বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক বায়ো-কম্পিউটার ‘CL1’ বাজারে উন্মোচন করেছে। প্রাথমিক মূল্য ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪২ লাখ টাকা)। গবেষকরা এটি সরাসরি কেনার পাশাপাশি ক্লাউড সিস্টেমের (Wetware-as-a-Service) মাধ্যমেও দূর থেকে ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করতে পারছেন। যেহেতু জীবিত কোষভিত্তিক প্রযুক্তিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা ও সাধারণ সফটওয়্যারের উপযোগী করে তোলা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ, তাই সাধারণ মানুষের ব্যবহার উপযোগী সাশ্রয়ী মূল্যে পার্সোনাল বায়ো-কম্পিউটার বাজারে আসতে আরও ১০ থেকে ১৫ বছর (২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের দিকে) সময় লাগতে পারে।
অধ্যাপক ও গবেষক, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়