নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়া বাংলাদেশের উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি। কিন্তু এর সঙ্গে কমবে এমন কিছু বাণিজ্যসুবিধা, যার ওপর দেশের রপ্তানি অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) এক হিসাব অনুযায়ী, এলডিসি হিসেবে পাওয়া শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উঠে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ বা বছরে প্রায় ৬৩৮ কোটি ডলার কমতে পারে।
বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের (বিএফটিআই) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তফা আবিদ খান গত সোমবার এক অনুষ্ঠানে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও করণীয় নিয়ে একটি উপস্থাপনায় এ তথ্য দেন।
বিএফটিআই ও অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) যৌথভাবে রাজধানীতে এই সেমিনারের আয়োজন করে।
মোস্তফা আবিদ খান তার উপস্থাপনায় ডব্লিউটিও তথ্য উপাত্ত ব্যবহার করেছেন। এ হিসাব ২০১৮ সালের বাণিজ্য-উপাত্ত ধরে করা হয়েছে। তাই এটি ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য চিত্র; বর্তমান রপ্তানি থেকে ঠিক কত আয় কমবে, তার হিসাব নয়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপানসহ কয়েকটি বড় বাজারে শুল্ক বাড়লে পোশাক রপ্তানির প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে।
উপস্থাপনায় বলা হয়, বাজারসুবিধা হারানোর পাশাপাশি রপ্তানি প্রণোদনা, ওষুধশিল্প, আন্তর্জাতিক সংস্থায় চাঁদা এবং উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার মতো সংস্কার জরুরি।
বিএফটিআইয়ের সুপারিশ হলো, উত্তরণের পর বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাজারসুবিধা ধরে রাখার পাশাপাশি পণ্য ও বাজার— দুই দিকেই রপ্তানি বাড়ানো। ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, রাজস্ব সংগ্রহ, বিনিয়োগ পরিবেশ, প্রযুক্তি, শ্রমমান ও উৎপাদনক্ষমতা উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব সংস্কার কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তার ওপর উত্তরণের পর বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে। নানা ধাপ পেরিয়ে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময় ঠিক করা হয়। কিন্তু বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে।
গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক)।
বিএফটিআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, সরকার মসৃণ, টেকসই ও স্থায়ী উত্তরণের জন্য ২০২৬-২৯ মেয়াদের জাতীয় পথনকশা (রোডম্যাপ) নিয়েছে। এতে চারটি পর্যায়ে কাজের কথা বলা হয়েছে। প্রথম পর্যায় হলো ২০২৬-২৭ অর্থবছর। এই পর্যায়ে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, ব্যবসার নিয়ম সহজ করা, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সুশাসন, বাণিজ্য সহজ করা এবং বিনিয়োগকারীর সুরক্ষায় জোর দেওয়া হবে।
দ্বিতীয় পর্যায় ২০২৬-২৮ অর্থবছর। এই পর্যায়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, পণ্যের মান ও স্বীকৃতি, বাজারসুবিধা নিয়ে আলোচনা, ওষুধশিল্প ও মেধাস্বত্বের প্রস্তুতি, দক্ষ জনশক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদেশি বিনিয়োগ, বন্দর দক্ষতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে কাজ হবে।
তৃতীয় পর্যায় ২০২৬-২৯ অর্থবছর। এই সময়ে শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে প্রযুক্তি ছড়িয়ে দেওয়া, শ্রমমান, নতুন পণ্য ও ব্র্যান্ড, ডিজিটাল সরবরাহব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজে বেসরকারি খাতকেও যুক্ত করা হবে।
সর্বশেষ পর্যায় ২০২৯ সালের দ্বিতীয়ার্ধ। এই পর্যায়ে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হবে। নীতি, শুল্ক, অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পূরণের কাজ হবে। চূড়ান্ত জাতীয় প্রস্তুতি প্রতিবেদন প্রকাশ এবং উত্তরণের পর প্রতিযোগিতা, রপ্তানি ও ঋণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।