পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থ ট্যানারির জন্য ‘এক্সিট প্ল্যান’

হাসান আরিফ, ঢাকা: সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি), ক্রোম রিকভারি ইউনিট (সিআরইউ) স্থাপন কিংবা প্রযোজ্য পরিবেশগত শর্ত পূরণে ব্যর্থ প্লট মালিকদের জন্য সম্মানজনকভাবে শিল্পনগরী ছাড়ার পরিকল্পনা বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ এবং অন্যান্য পরিবেশগত শর্ত অনুসরণের ভিত্তিতে প্লট পরিচালনাসংক্রান্ত বিধিবিধান চূড়ান্ত করা হবে। এরপরও যেসব প্লট মালিক নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাদের জন্য এক্সিট প্ল্যান তৈরি করা হবে।

গত মাসে শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কার ও উন্নয়ন, ট্যানারিগুলোর নিজস্ব ইটিপি স্থাপন এবং পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় চামড়াশিল্পের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ঋণের সুদ কমানো ও আগের ঋণ পুনঃতফসিলের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্তও হয়। 


সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সাভারের চামড়া শিল্পনগরীর ১৯টি ট্যানারি নিজস্ব ইটিপি স্থাপনে আগ্রহী। ইটিপি ও ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট— দুটিই স্থাপনে আগ্রহী ১৫টি ট্যানারি। শুধু ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট স্থাপন করতে চায় ১০টি ট্যানারি। অন্যদিকে ১১টি ট্যানারি ইটিপি বা ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট— কোনোটিই স্থাপনে আগ্রহী নয়। এসব ট্যানারির প্রতিটির প্লটের আয়তন ৫০ হাজার বর্গফুটের বেশি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সভায় বড় ও আর্থিকভাবে সক্ষম ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বর্জ্য পরিশোধনাগার স্থাপনে উৎসাহিত করার বিষয়ে মত দেওয়া হয়। নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করা হলে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের ওপর চাপ কমবে বলে সভায় মত দেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে সিইটিপির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নির্ধারণে ট্যানারিগুলো থেকে নির্গত বর্জ্যের পরিমাণ এবং ঈদুল আজহার সময় সর্বোচ্চ বর্জ্য নির্গমনের মাত্রা নিরূপণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, শুধু রপ্তানিমুখী নয়, স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী ট্যানারিগুলোকেও পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুসরণ করতে হবে। বড় ও সক্ষম ট্যানারিগুলোকে দ্রুত নিজস্ব ইটিপি ও ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। বর্তমান সিইটিপি চালু রেখেই পর্যায়ক্রমে এর ত্রুটি সংশোধন ও সক্ষমতা বাড়ানো হবে। এক্ষেত্রে ট্যানারিগুলোর নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যতে বর্জ্য উৎপাদনের পরিমাণ বিবেচনায় নেওয়া হবে।

প্লট পরিচালনাসংক্রান্ত বিধিবিধান চূড়ান্ত হওয়ার পরও যেসব প্লট মালিক ইটিপি, ক্রোমিয়াম রিকভারি ইউনিট স্থাপন কিংবা প্রযোজ্য পরিবেশগত শর্ত পূরণ করতে পারবেন না, তাদের জন্য সম্মানজনকভাবে শিল্পনগরী ছাড়ার পরিকল্পনা বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ তৈরি করা হবে। এ সংক্রান্ত কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে শিল্প মন্ত্রণালয়, বিসিক ও ঢাকা ট্যানারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট ওয়েস্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট কোম্পানি লিমিটেডকে (ডিটিআইইডব্লিউটিপিসিএল)।

ঋণের সুদ কমানোর সম্ভাবনা যাচাই
চামড়াশিল্পের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় ঋণের সুদের হার কমানো এবং আগের ঋণ পুনঃতফসিলের সম্ভাবনা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে সভায়। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দেওয়া ঋণের বর্তমান সুদের হার কমানো যায় কি না এবং আগের ঋণ পুনঃশ্রেণীকরণ বা পুনঃতফসিলের সুযোগ রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করবে অর্থ বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক।

সভাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরজনিত ঋণ ও সুদের চাপ, চলতি মূলধনের সংকট, নিজস্ব ইটিপি স্থাপনে অর্থায়নের সমস্যা, সবুজ অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা এবং হাজারীবাগের জমিসংক্রান্ত জটিলতা চামড়াশিল্পের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সভায় উল্লেখ করা হয়, এসব কারণে শিল্পটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে।

হাজারীবাগের জমিসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনেও উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনকে (বিটিএ) জমির মালিকানা, হালনাগাদ ভূমি রেকর্ড ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করতে হবে। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে কাজ করবে বিসিক ও বিটিএ।

কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়ার মান উন্নয়নে উদ্যোগ
চামড়া শিল্পনগরীর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আগ্রহী শিল্পমালিকদের শিল্পনগরীর ভেতরে খালি প্লট বরাদ্দের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। এ বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরির সুযোগ পরীক্ষা করবে বিসিক ও বিটিএ। পাশাপাশি পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়, এমন কঠিন বর্জ্য নিরাপদে অপসারণের জন্য ল্যান্ডফিল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কাঁচা চামড়ার মান নিশ্চিত করতে সরকারি বা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পশু জবাইখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই এবং বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও বিটিএ।

এছাড়া দেশি ও বিদেশি— উভয় বাজারের জন্য কাঁচা চামড়া থেকে প্রক্রিয়াজাত চামড়া পর্যন্ত পণ্যের উৎস শনাক্ত ও অনুসরণের ব্যবস্থা (ট্রেসেবিলিটি) চালু করতে বিধিবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিএ।

সভাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ট্যানারি পর্যায়ে প্রাথমিক বর্জ্য পরিশোধন, ক্রোমিয়ামযুক্ত ও ক্রোমিয়ামবিহীন বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পরিবেশগত মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জৈব দূষণ, ক্লোরাইডসহ বিভিন্ন দূষক উপাদানের গ্রহণযোগ্য মাত্রা বাংলাদেশের বাস্তবতার আলোকে পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি দেখবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তর।

সভায় শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীর বর্তমান কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার সংস্কার ও আধুনিকায়নের বিষয়ে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

শিল্পমন্ত্রী আরও বলেন, ক্রোমিয়ামযুক্ত ও ক্রোমিয়ামবিহীন বর্জ্য আলাদা করা, রাসায়নিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ক্রোমিয়ামযুক্ত বর্জ্য ও পরিশোধনাগারের তলানি পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ে সরকার শিল্পমালিকদের সঙ্গে কাজ করছে। নতুন সিইটিপির ক্ষেত্রে উপযুক্ত আন্তর্জাতিক বা ইউরোপীয় মানদণ্ড, প্রযুক্তি, পরিশোধন কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।