জাতীয় অর্থনীতি ডেস্ক: মেগা প্রকল্প মানেই কি মেগা দুর্নীতি? ক্ষমতায় যাওয়ার আগে মেগা প্রকল্পের বিরোধিতা, অথচ সরকার গঠনের কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক বড় প্রকল্প অনুমোদন! পদ্মা ব্যারাজ থেকে তিনটি মেট্রোরেল, ঢাকা-কুমিল্লা উড়াল রেলপথ থেকে দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু।
বিপুল অর্থের এসব পরিকল্পনা নিয়ে উঠছে ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা ও আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন। তাহলে প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে মেগা প্রকল্পের পথেই কি হাঁটছে বিএনপি সরকার?
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যয় এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দেবে বিএনপি। এর আগে ২৫ নভেম্বর বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও কর্মসংস্থান, আত্মকর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাসের মধ্যেই বড় প্রকল্প অনুমোদনের পথে হাঁটে সরকার। ১৩ মে একনেক সভায় অনুমোদন পায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। পুরো অর্থই জোগান দেওয়ার কথা সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে। তবে প্রকল্পটির সর্বশেষ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়েছিল ২০১৩ সালে। দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে নদীর গতিপথ ও বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে পুরোনো সমীক্ষার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত মাসে অনুমোদন দেওয়া হয় তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প, যেগুলোর মোট ব্যয় প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫, সাউদার্ন রুটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। বিমানবন্দর-কমলাপুর ও পূর্বাচল রুটের এমআরটি লাইন-১-এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। আর হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫, নর্দার্ন রুটে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আগের দুই প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
শুধু এখানেই শেষ নয়। দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, দ্বিতীয় যমুনা সেতু, ঢাকা-চট্টগ্রাম ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা-কুমিল্লা কর্ডলাইন রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। শ্যামপুর থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রস্তাবিত ৮১ কিলোমিটার উড়াল রেলপথে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৩ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি খরচ পড়বে প্রায় ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হকের মতে, প্রয়োজনীয় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ গণপরিবহনের উন্নয়ন ছাড়া শুধু মেট্রোরেল দিয়ে ঢাকার যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, প্রকল্প বড় না ছোট, সেটি মুখ্য নয়; বিনিয়োগের তুলনায় অর্থনৈতিক সুফল কতটা পাওয়া যাবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। বড় প্রকল্পের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের মতো ছোট প্রকল্পে বিনিয়োগ করলে জনগণ দ্রুত সুফল পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক সংকটের মধ্যে ঋণের বোঝা ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়লে বড় প্রকল্প মাঝপথে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে দরকষাকষিতে দেশের সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রকল্পের ব্যয়, প্রয়োজনীয়তা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা যাচাই করাও জরুরি।
সব মিলিয়ে, মেগা প্রকল্প নেওয়া হবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন-কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় করলে জনগণ ও অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে? বিএনপি সরকারের সামনে এখন সেই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত উত্তর দেওয়ার চ্যালেঞ্জ।
—জা. অর্থনীতি/এলএটি